তেহরান, ওয়াশিংটন এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তির বর্তমান পরিস্থিতি ও সময়সীমা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। যেখানে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, এই চুক্তির বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, রোববারই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
দুই পক্ষের ভিন্নধর্মী এসব বার্তা এক গভীর অনিশ্চয়তাকে ফুটিয়ে তুলছে। কয়েক সপ্তাহের আলোচনা কি আসলেই বড় কোনও সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে, নাকি শেষ মুহূর্তে এসে এখনও রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি দেশটির আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানে চলমান সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) বিষয়ে তেহরান এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি কিংবা ঘোষণা করেনি। প্রতিবেদনে দেশটির কট্টরপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। তারা বলেছেন, এই চুক্তি কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রভাবকে দুর্বল করে দিতে পারে।
• কী বলছেন ট্রাম্প?
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি আজই স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি বলেছেন, চুক্তি সইয়ের পরপরই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে আলোচনায় বারবার বিলম্ব হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, একটি বড় ধরনের সাফল্য খুব দ্রুতই আসছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই দ্রুত সাফল্য আসার সময়সীমা নিয়ে বিশ্লেষকরা এখন সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
• যা বলছে ইরান
ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চুক্তির বিষয়ে তেহরান এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি কিংবা ঘোষণা করেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার বলেছেন, চুক্তি সইয়ের তারিখ এখনও নির্ধারণ করা হয়নি এবং এটি রোববার হচ্ছে না।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার কাছাকাছি রয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলছেন, আলোচনা এখনও চলছে এবং কোনও চূড়ান্ত চুক্তি নিশ্চিত করা হয়নি।
একাধিক মধ্যস্থতাকারী দেশ আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চুক্তিটি সই হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। তাদের এই ইঙ্গিতের মাঝেই চুক্তি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে; যা কূটনৈতিক আশাবাদ এবং সরকারি সতর্কতার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ব্যবধান স্পষ্ট করছে।
চলমান মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রোববার কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছেছে বলে ইরানি গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে। কূটনীতিকরা এই সফরকে চুক্তির ‘‘চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর করার’’ লক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। মহাদূতিয়ালিতে সংশ্লিষ্ট পাকিস্তানও বলেছে, আগীম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে।
• চূড়ান্ত করার পর্যায়ে পৌঁছায়নি চুক্তিটি
তবে ইরানি কর্মকর্তারা এই সময়সীমার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের জন্য ইরানি আলোচক দলের জেনেভা কিংবা অন্য কোথাও যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, চুক্তিটি এর আগে কখনোই এত কাছাকাছি পৌঁছায়নি। যদিও এটি এখনও চূড়ান্ত করার পর্যায়ে আসেনি।
কোনও সুনির্দিষ্ট সময়সীমার কথা না জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘আগামী দিনগুলোতে এই চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়া যায় না।’’
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে জনসমক্ষে আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, চুক্তিটি আজই সই হওয়ার কথা রয়েছে এবং এর মাধ্যমে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। এই প্রণালি খুলে দেওয়া হলে তা বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল নৌপথে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করবে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রস্তাবিত এই রূপরেখায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আরও আলোচনা শুরু করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে কোনও পক্ষই এখনও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি।
কূটনীতিকরা বলছেন, এই উদীয়মান চুক্তিটি এখনও বেশ ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, ইউরেনিয়ামের মজুত এবং লেবাননের চলমান উত্তেজনাসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো এই চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই পরস্পরবিরোধী বার্তা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকেও সামনে এনেছে। সেখানে রক্ষণশীল আইনপ্রণেতা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রস্তাবিত এই চুক্তির সমালোচনা করেছে। এতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চুক্তিটি ওয়াশিংটনের কাছে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার শামিল হতে পারে।
চুক্তির কোনও যৌথ খসড়া প্রকাশ না করা এবং চুক্তি সইয়ের নির্দিষ্ট কোনও স্থান নিশ্চিত না হওয়ায় সব পক্ষের কর্মকর্তারাই এখন বাস্তব আলোচনার চেয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতেই বেশি ব্যস্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকার পরও চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
সূত্র: এএফপি, রয়টার্স।
এসএস
