সুইজারল্যান্ডে জনসংখ্যা এক কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব গণভোটে প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির ভোটাররা। ডানপন্থি সুইস পিপলস পার্টি (এসভিপি-ইউডিসি) সমর্থিত এই উদ্যোগের বিপক্ষে ৫৪ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়েছে।
রোববার অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর স্বস্তি প্রকাশ করেছে দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।
ফলাফল ঘোষণার পর সুইজারল্যান্ডের বিচার ও পুলিশমন্ত্রী বিট ইয়ান্স বলেন, আজকের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নাগরিকেরা স্থিতিশীলতা, উন্মুক্ততা এবং নির্ভরযোগ্যতার পক্ষে বার্তা দিয়েছেন।
গণভোটের আগে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে দেখা গিয়েছিল, প্রস্তাবটির বিরোধীরা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি পাস হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ইইউর সদস্য না হলেও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে জোটটির ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ইইউ দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ইউডিসি প্রস্তাবিত উদ্যোগটির লক্ষ্য ছিল ২০৫০ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের স্থায়ী জনসংখ্যা এক কোটির বেশি হতে না দেওয়া। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৯৫ লাখ।
সুইজারল্যান্ডে বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। ইউডিসির দাবি ছিল, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ না করলে অবকাঠামো, আবাসন এবং জনসেবার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
গণভোটে শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, অধিকাংশ ক্যান্টনেও প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ‘না’ ভোট পড়েছে বাসেল-শ্টাড, নিউশাতেল এবং জেনেভা ক্যান্টনে। দেশটির বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন সুইস ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, ইউডিসির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সুইস জনগণ আত্মগুটিয়ে নেওয়া এবং বিদেশিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে ইউডিসির সভাপতি মার্সেল ডেটলিং ফলাফলকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। যদিও গ্রামীণ এলাকাগুলোতে দলটির প্রস্তাব তুলনামূলক বেশি সমর্থন পেয়েছে।
গণভোটের আগে সুইস সরকার, পার্লামেন্ট, প্রধান রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছিল।
গ্রিন পার্টি ফলাফলকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, ইউডিসির ‘বিশৃঙ্খলাপূর্ণ উদ্যোগ’ স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
দেশটির সোশ্যালিস্ট পার্টি সংসদ সদস্য বেনোয়া গাইয়ার বলেন, আমি আশ্বস্ত বোধ করছি। এই উদ্যোগ বলির পাঁঠা খোঁজার রাজনীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছিল।
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের বিশ্লেষক জেস মিডলটনের মতে, প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় সুইজারল্যান্ড বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্থিরতা এড়াতে পেরেছে।
গণভোটে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৯ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর গড় প্রায় ৪৯ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি।
জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক পাসকাল সিয়ারিনি বলেন, প্রচারণা অত্যন্ত তীব্র হওয়ায় ভোটার উপস্থিতি বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তার মতে, এটি শুধু অভিবাসননীতি নয়, সুইজারল্যান্ডের ইউরোপনীতি নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট ছিল।
প্রস্তাবটি পাস হলে এবং ২০৫০ সালের আগে জনসংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে গেলে সুইজারল্যান্ডকে দুই বছরের মধ্যে ইইউর সঙ্গে মানুষের অবাধ চলাচল সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করতে হতো। এছাড়া আশ্রয় ও নিরাপত্তা বিষয়ক আরও কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।
প্রস্তাবটির সমর্থকেরা আবাসন সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, যানজট, উপচে পড়া ট্রেন, অপরাধ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ এবং শিক্ষার মান কমে যাওয়ার বিষয়গুলোকে প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটে হেরে গেলেও ইউডিসি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। পাসকাল সিয়ারিনি বলেন, পার্লামেন্টে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট পাওয়া একটি দলের প্রস্তাবের পক্ষে প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট পড়া দেখায় যে দলটি তাদের মূল সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরেও সমর্থন আদায় করতে পেরেছে।
পার্লামেন্টে ইউডিসির দলনেতা টমাস অ্যাশি একই মত প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, ৪৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট একটি খুব শক্তিশালী বার্তা, যা দেখায় যে সুইস জনগণের বড় একটি অংশ বর্তমান ধরণের অভিবাসন অব্যাহত থাকুক, তা চায় না।
সুইস ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হওয়াকে স্বাগত জানালেও বলেছে, অভিবাসন প্রশ্নটি যে জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়, ফলাফল তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত আরেকটি গণভোটে সুইস ভোটাররা বেসামরিক সেবায় যোগদানের নিয়ম কঠোর করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন।
ইউরোপজুড়ে সামরিক সক্ষমতা জোরদারের প্রেক্ষাপটে সুইস সরকার এই পদক্ষেপের পক্ষে ছিল। তবে বামপন্থি দলগুলো এর বিরোধিতা করে বলেছে, এতে সামরিক সেবার বিকল্প হিসেবে বেসামরিক সেবার ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সুইজারল্যান্ডে পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। ২০০৯ সালে বিবেকগত কারণে সামরিক সেবা এড়িয়ে বেসামরিক সেবায় যোগদানের নিয়ম শিথিল করার পর থেকে এই বিকল্প বেছে নেওয়া মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের মতে, এই প্রবণতা এখন সামরিক বাহিনীর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ইনফোমাইগ্রেন্টস।
এসএস
