মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নাটুকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন; তা কখনোই ইরানের জনগণের জন্য কোওে যুদ্ধ ছিল না, মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠনের কোনও কৌশলগত প্রচেষ্টা ছিল না। এমনকি ইরানকে দমনের কোনও সুসংগত উদ্যোগও ছিল না। এই যুদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট কোনও লক্ষ্য, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কিংবা যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার কৌশল ছাড়া চালানো এক অভিযান। স্বাভাবিকভাবেই এই যুদ্ধ উভয়-সংকটের লড়াই হিসেবে শেষ হয়েছে, যেখানে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া কোনও উদ্দেশ্যই বাস্তবায়িত হয়নি। ধর্মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটেনি, ইরানের আঞ্চলিক প্রকল্প নস্যাৎ করা যায়নি এবং কোনও অর্থপূর্ণ বা দীর্ঘস্থায়ী উপায়ে দেশটির ক্ষমতাও খর্ব করা সম্ভব হয়নি।
ইরানি মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম যেমন স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই যুদ্ধ কখনোই ইরানের জনগণের অধিকারের বিষয় ছিল না... কর্তৃপক্ষ এটিকে দমনপীড়ন তীব্র করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রতিশোধের ভয়ে নিজের পুরো নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়ে তেহরানের এক নারী বলেছেন, ‘‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যেকোনও শান্তি চুক্তি মানে আমার অত্যাচারীদের সঙ্গে চুক্তি করা।’’
এসব কথা কেবল কোনও আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এগুলো প্রমাণ করে, যুদ্ধ ইরানের ভেতরে কোনও পরিবর্তন আনতে পারেনি। এই যুদ্ধ ইরানের সরকারকে একটি চিরচেনা এবং কার্যকর বয়ান উপহার দিয়েছে; কণ্ঠরোধ ও ভুক্তভোগী হওয়ার সেই ভাষা—যা তারা গত চার দশক ধরে রপ্ত করেছে।
দ্য টেলিগ্রাফের ডেভিড ব্লেয়ার মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৩ হাজার বিমান হামলাও এই শাসনের পতন ঘটাতে পারেনি। ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে ভেঙে দিতে পারেনি কিংবা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবও খর্ব করতে পারেনি। উল্টো এই অভিযান শেষ হলো সেই নেতৃত্বের সঙ্গেই তড়িঘড়ি করে একটি আংশিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে, যাদের একসময় ক্ষমতাচ্যুত করার শপথ নিয়েছিলেন ট্রাম্প।
আঞ্চলিক রাজধানীগুলোতে এখন যে প্রশ্নটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তা এড়ানো অসম্ভব : এই চুক্তি কি চার মাসের যুদ্ধ, শত কোটি ডলারের ব্যয়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে যাওয়া এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার মতো পরিস্থিতির যোগ্য ছিল?
এর সৎ উত্তর হলো, না।
ওয়াশিংটনের দাবি করা কৌশলগত ফলাফলের একটিও অর্জন করতে পারেনি। প্রকৃত বিজয়ের জন্য ইরানের সক্ষমতার বাস্তব অবক্ষয়, দেশটির আঞ্চলিক আচরণে পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা বা পারমাণবিক ইস্যুর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির প্রয়োজন ছিল। এর কিছুই ঘটেনি। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের অ্যালান আয়ার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তার সবচেয়ে শক্তিশালী কার্ড—অর্থাৎ সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকিকে খেলো করে ফেলেছে। আমরা এটি ব্যবহার করেছি, কিন্তু তারা এখনও টিকে আছে। এখন আর প্রভাব খাটানোর কোনও সুযোগ কি বাকি রইল?
• যেভাবে ওয়াশিংটনের ইরান চুক্তি ভেস্তে দিতে পারেন নেতানিয়াহু
ইরানও নিজের দিক থেকে কোনও প্রথাগত অর্থে সামরিকভাবে জয়ী হয়নি। তারা বেদনাদায়ক আঘাত সহ্য করেছে, জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের হারিয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তারা অটুট থেকে গেছে। আর মধ্যপ্রাচ্যে টিকে থাকাটাই এক ধরনের বিজয়। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ইরান এই যুদ্ধে তার উদ্দেশ্য অর্জন করেছে; তারা টিকে গেছে।
তবুও সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ওয়াশিংটন কিংবা তেহরান নয়, বরং উপসাগরীয় দেশগুলো। যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছিল, তখন উপসাগরীয় দেশগুলো এর খেসারত দিয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরানের কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা চালানোর জন্য ইরাকে নতুন গোপন সেল গঠন করেছে; যাতে প্রথাগত মিলিশিয়াদের এড়িয়ে শনাক্ত হওয়া থেকে বাঁচা যায়।
অন্য কথায় বলা যায়, এসব আঘাত এসেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে, আর চুক্তিটি বাগিয়ে নিয়েছে ইরান। এটিই হলো আপাত বৈপরীত্য। যেসব রাষ্ট্র আশা করেছিল, এই যুদ্ধ ইরানকে দুর্বল করবে, তারা উল্টো নিজেদের এমন এক চুক্তির মুখোমুখি পেয়েছে; যা তেহরানকে আবার অপরিহার্য এক আলোচনার অংশীদার হিসেবে পুনপ্রতিষ্ঠিত করেছে। মার্কিন-ইরান এই সমঝোতা উপসাগরীয় সরকারগুলোকে সম্পূর্ণ শূন্যহাতে ফেলে গেছে। ইরানকে দমানো যায়নি, তার ইরাকি প্রক্সিগুলোকে ভেঙে দেওয়া যায়নি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তারও কোনও উন্নতি হয়নি।
এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর ভঙ্গুরতাকে উন্মোচিত করেছে। ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাকে কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখে, শেষ অবলম্বন হিসেবে নয়।
তাহলে এরপর কে আর ট্রাম্পকে বিশ্বাস করবেন? কেবল তারাই করবেন; যারা তার দেওয়া ভূমিকা পালনে আগ্রহী। ট্রাম্প সমালোচকদের ‘‘ঈর্ষান্বিত, বোকা বা বিদ্বেষপরায়ণ’’ বলে এই চুক্তিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। তবুও খোদ মার্কিন সমালোচকরা পরিষ্কারভাবে বলেছেন, এই চুক্তি মূল সমস্যাগুলোর কোনোটিরই সমাধান করে না, ইরানের ওপর কোনও অর্থপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে না এবং এর আঞ্চলিক আচরণেও কোনও পরিবর্তন আনবে না। এই সমালোচকদের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপ-পররাষ্ট্রসচিব ওয়েন্ডি শেরম্যানও রয়েছেন।
অ্যালান আয়ার আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘‘আমরা সামরিক বিকল্প ব্যবহার করেছি... এবং তারা এখনও টিকে আছে। এখন আমরা তাদের কী দিয়ে হুমকি দেব?’’
এই উপসংহার থেকে এড়ানো কঠিন। এটি ছিল বিজয়ী ছাড়া এক যুদ্ধ, যার পর এমন চুক্তি হলো যেখান থেকে ইরান এই দাবি করার মতো পর্যাপ্ত রাজনৈতিক অক্সিজেন নিয়ে বের হয়ে এসেছে যে, তারা পরাজিত হয়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনও কৌশল, কোনও সুবিধা এবং নতুন শর্ত আরোপের সক্ষমতা ছাড়াই এই সংঘাত থেকে বিদায় নিচ্ছে। আর উপসাগরীয় দেশগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতনভাবে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে যে, তাদের নিরাপত্তা অন্যের পরিবর্তনশীল অগ্রাধিকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
মধ্যপ্রাচ্যে, বিজয় ঘোষণা করার জন্য প্রায়ই শুধু পরাজিত না হওয়াই যথেষ্ট। ইরান ঠিক সেটাই করেছে।
• মিডল ইস্ট মনিটরে ব্রিটিশ-ইরাকি বংশোদ্ভূত লেখক কারাম নামার নিবন্ধ।
এসএস
