লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার নিজ দলের ভেতরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে ব্রিটেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন কনজারভেটিভ পার্টি যে প্রবণতা তৈরি করেছিল, লেবার পার্টির এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত যেন তারই ধারাবাহিকতা।
গত কয়েক মাস ধরে জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা ক্রমাগত তলানিতে ঠেকা এবং নিজ দলের এমপিদের রাজনৈতিক চাপের মুখে সোমবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন স্টারমার। লেবার পার্টির প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যান্ডি বার্নহ্যাম নিশ্চিত করেছেন, স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার লড়াইয়ে নামবেন তিনি।
২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে স্টারমার সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত প্রধান বিরোধী দল টরিরা (কনজারভেটিভ পার্টি) পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন করেছে।
শীর্ষ পদে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই স্টারমার বারবার নেতা বদলের এই অরাজকতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ দুই বছরেরও কম সময়ের মাথায় স্টারমার নিজেও একই ভাগ্যের পরিহাসে পড়লেন। কী ঘটেছিল পূর্বসূরীদের ভাগ্যে?
• ডেভিড ক্যামেরন, ২০১০ সালের মে থেকে ২০১৬ সালের জুলাই
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) সিদ্ধান্ত ক্যামেরনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের অবসান ঘটায়।
২০১৬ সালের জুনের গণভোটে ব্রিটিশ নাগরিকরা ইইউ ত্যাগের পক্ষে রায় দেওয়ার পর ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে প্রচার চালানো ক্যামেরন পদত্যাগ করেন।
• থেরেসা মে, জুলাই ২০১৬- জুলাই ২০১৯
ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর ব্রেক্সিট গণভোটের পরবর্তী বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে থেরেসা মে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ব্রেক্সিট আলোচনায় নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পরের বছরই তিনি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কিন্তু তার সেই চাল উল্টো ফল দেয়। তার দল পার্লামেন্টে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলে।
পার্লামেন্টে নিজের ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করাতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৯ সালের মে মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে কনজারভেটিভরা চরম পরাজয়ের মুখোমুখি হয়; যা শেষ পর্যন্ত থেরেসাকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
• বরিস জনসন, জুলাই ২০১৯-সেপ্টেম্বর ২০২২
নিয়ম ভেঙে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য পরিচিত ছকভাঙা রাজনীতিবিদ বরিস জনসনকে করোনাভাইরাস মহামারি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের চূড়ান্ত বিদায়ের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগাম সাধারণ নির্বাচনে তিনি কনজারভেটিভদের এক বিশাল জয় এনে দেন।
কিন্তু একের পর এক কেলেঙ্কারিতে দুর্বল হয়ে পড়া জনসন শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের গণ-পদত্যাগের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
• লিজ ট্রাস, সেপ্টেম্বর ২০২২-অক্টোবর ২০২২
বিপর্যয়কর কর ছাড়ের ‘মিনি-বাজেট’ পেশ করে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন; যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত।
তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাজারকে আতঙ্কিত করে তোলে এবং যুক্তরাজ্যকে এক আর্থিক ধসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এর ফলে নিজ দলের সমর্থন হারিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন তিনি।
• ঋষি সুনাক, অক্টোবর ২০২২-জুলাই ২০২৪
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে স্টারমারের কাছে হেরে কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটানোর আগে সুনাক ২০ মাস দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন।
লিজ ট্রাসের তৈরি করা চরম বিপর্যয়ের পর কিছুটা স্থিতিশীলতা আনলেও টরি দলের ভেতরের তিক্ত কোন্দল থামাতে ব্যর্থ হন তিনি।
ব্যক্তিগতভাবে বিপুল ধন-সম্পদের মালিক এই সাবেক অর্থায়নকারী শেষ পর্যন্ত জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটে ভুগতে থাকা সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে পারেননি।
সূত্র: এএফপি।
এসএস
