কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হতে যাচ্ছে—আমরা প্রতিনিয়ত এমনটাই শুনছি। ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিরা বলেছেন, ইতোমধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে এগিয়ে গেছে এআই। তবে জাতিসংঘের নতুন এক প্রতিবেদনে আরও ভয়াবহ আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো মানবজাতির কিছু কুৎসিত পক্ষপাতিত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে।
গবেষকেরা ১৩৩টি এআই সিস্টেম পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক (৪৪ শতাংশ) সিস্টেমে লিঙ্গবৈষম্যের প্রমাণ পেয়েছেন। অন্যদিকে, এক-চতুর্থাংশের বেশি সিস্টেমে একই সঙ্গে লিঙ্গবৈষম্য ও বর্ণবাদ উভয়েরই উপস্থিতি দেখা গেছে।
জাতিসংঘ বলেছে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (এলএলএম) বারবার নারীদের ঘরবাড়ি, পরিবার ও সন্তান লালন-পালনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে পুরুষদের যুক্ত করেছে ব্যবসা, নেতৃত্ব ও কর্মজীবনে সফলতার সঙ্গে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এআই সিস্টেমগুলো এমন সব উত্তর তৈরি করেছে, যেখানে নারীদের যৌনতার বস্তু কিংবা পুরুষের অধীনস্ত হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতাবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, গবেষকরা যখন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোকে কোনও ব্যক্তির লিঙ্গ দিয়ে শুরু হওয়া একটি বাক্য সহজভাবে সম্পন্ন করতে বলেছিলেন, তখন প্রতি পাঁচটি উত্তরের মধ্যে প্রায় একটি উত্তর লিঙ্গবৈষম্যমূলক বা নারীবিদ্বেষী হিসেবে এসেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমনকি কিছু উত্তর নারীদের সম্পত্তি বা বস্তু হিসেবেও বর্ণনা করেছে।
জাতিসংঘ বলেছে, কোটি কোটি মানুষের ই-মেইল লেখা, প্রেজেন্টেশন ও কনটেন্ট তৈরি এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কাজে যেহেতু দিন দিন এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে, তাই এই বৈষম্যমূলক অ্যালগরিদমের মাধ্যমে বিদ্যমান অসমতাগুলো আরও বেশি সুদৃঢ় হচ্ছে।
ইউএন উইমেন বলেছে, এটি কোনও বাগ নয়; বরং এআই ইন্টারনেট থেকে এসব শেখে; যা গত কয়েক দশকের নানা রকম গৎবাঁধা ধারণা, কুসংস্কার ও বৈষম্যে ভরপুর। ফলে এআই মানুষের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত তা মানুষের সেই পক্ষপাতগুলোকেই পুনরায় ফুটিয়ে তোলে।
সংস্থাটির ডিজিটাল প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান জয়তমা বিক্রমনায়েকে বলেন, এআই মডেলগুলো মানুষের দ্বারা এবং মানুষকে নিয়ে লেখা বহু দশকের টেক্সট থেকে এসব পক্ষপাত শিখছে। আর এমন এক সময়ের দুনিয়া থেকে এগুলো নেওয়া, যেখানে নারীদের স্থান দেওয়া হয়েছিল ঘর ও পরিবারে এবং পুরুষদের স্থান দেওয়া হয়েছিল ব্যবসা ও কর্মজীবনে।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, নারীরা ইতোমধ্যে অনলাইনে অসম মাত্রায় হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন এবং এআইয়ের মাধ্যমে কিছু কিছু সহিংসতার রূপ তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়া আরও সহজ হয়ে উঠছে।
ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া নারী মানবাধিকার কর্মী, সমাজকর্মী ও নারী সাংবাদিকদের মধ্যে প্রায় প্রতি চারজনের একজন এআইয়ের সহায়তায় অনলাইন সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ১২ শতাংশ বলেছেন, তাদের সম্মতি ছাড়াই ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করা হয়েছে। অন্যদিকে ৬ শতাংশ বলেছেন, তাদের ডিপফেক বা বিকৃত ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইউএন উইমেন এআইয়ের জীবনচক্রের প্রতিটি স্তরে উন্নয়ন থেকে শুরু করে তা বাস্তবায়ন ও শাসন বা নীতি নির্ধারণের প্রতিটি ধাপে লিঙ্গ সমতা এবং নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার ও অভিজ্ঞতার বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
গবেষকেরা অনেক সিস্টেমজুড়ে বর্ণবাদী পক্ষপাতও খুঁজে পেয়েছেন। যা এই উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে যে, এআই কেবল নারীদেরই নয়, বরং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে প্রচলিত গৎবাঁধা কুসংস্কারগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি।
এসএস
