যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির সবচেয়ে বড় শিকার হয়তো ইসরায়েলের ইরান-কৌশল নয়, বরং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সেই রাজনৈতিক ব্র্যান্ড—যা তিনি কয়েক দশক ধরে তৈরি করেছিলেন। তিনি নিজেকে এমন একজন ইসরায়েলি নেতা হিসেবে জাহির করেছিলেন, যিনি ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী চালাতে পারেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কী ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছেন সেই বিষয়ে এমন মন্তব্য করেছেন একাধিক বিশ্লেষক, সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এবং কূটনীতিক।
নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন একটি সাহসী দাবির ওপর: তিনি একাই ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কৌশলগতভাবে একই অবস্থানে রাখতে পারেন। রিপাবলিকানদের সমর্থনপুষ্ট হয়ে নিজেকে একমাত্র ইসরায়েলি নেতা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি, যিনি একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। তিনি জোর দিয়ে বলতেন, কেবল ক্রমাগত সামরিক চাপই তেহরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
ক্ষমতার চূড়ায় থাকার সময় কূটনীতিকরা তাকে ‘‘মার্কিনদের কানপড়া দেওয়ার লোক’’ হিসেবে অভিহিত করতেন। তিনি এমন একজন ইসরায়েলি নেতা যিনি ফোনে কথা বলেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ ইসরায়েলের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারতেন। কূটনীতিকরা বলছেন, অন্য কোনও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মার্কিন কংগ্রেসে এতবার ভাষণ দেননি কিংবা আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমন দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক পুঁজি তৈরি করতে পারেননি।
কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের অবসানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের চুক্তিতে পরিষ্কার হয়েছে, কীভাবে সেই পরিস্থিতি এখন উল্টে গেছে। ওয়াশিংটনের ইরান নীতি নির্ধারণ করার পরিবর্তে নেতানিয়াহু এখন তা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক সমঝোতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন; যা ইসরায়েলের আপত্তিকে কেবলই এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ডেনিস রস বলেন, দেশের মাটিতেও এই হিসাব-নিকাশ সমানভাবে কঠোর। বর্তমানে নেতানিয়াহু এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের (যিনি সংঘাতের অবসান চান) এবং নিজের দেশের কট্টর সমর্থকদের (যারা বিশেষ করে লেবাননে কোনও ছাড় দিতে নারাজ) মাঝখানে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। সেনা প্রত্যাহার করলে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি রয়েছে, আবার যুদ্ধ বাড়ালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়।
যে যুদ্ধকে নেতানিয়াহু ইরানের মুখোমুখি হওয়া নেতা হিসেবে নিজের গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, সেটি হয়তো তার ক্ষমতার মূল উৎসকে গুঁড়িয়ে দেওয়া সংঘাত হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিদেশে বিচ্ছিন্ন, সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের দ্বারা বাধাগ্রস্ত এবং শরতের নির্বাচনের আগে নাজুক অবস্থায় থাকা নেতানিয়াহু দেখছেন, যে রাজনৈতিক সম্পদের ওপর ভর করে তিনি ক্যারিয়ার গড়েছিলেন, সেটিই এখন তার সবচেয়ে বড় দায় বা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহু চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন, লেবাননের হিজবুল্লাহর পরাজয় কিংবা উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন—এর কোনোটিই নিশ্চিত করতে পারেননি।
নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা আবিব বুশিনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য এক ভয়াবহ আঘাত। তিনি কেবল ইরানের সঙ্গেই যুদ্ধে হারেননি, বন্ধু হিসেবে ট্রাম্পকেও হারিয়েছেন। বর্তমানে তিনি শুধু আন্তর্জাতিকভাবেই বিচ্ছিন্ন নন, বরং ট্রাম্পের সঙ্গেও বড় ধরনের বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনও সাড়া দেয়নি। তবে চলতি মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ককে অংশীদারদের মধ্যকার সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যেখানে তারা অনেক সময় একমত হন এবং কখনো কখনো দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ইরান ও তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বিশাল অর্জনকে খাটো করার জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রচারণা চলছে।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এই যুদ্ধে অসাধারণ অংশীদার ছিল; যা ইরানি সরকারের সামরিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
• প্রকাশ্য তিরস্কার
বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতার মধ্যকার এই দ্বিমত ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়েও লক্ষ্যের ক্রমবর্ধমান পার্থক্যের দিকটিই বেশি তুলে ধরছে। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চান। আর নেতানিয়াহু ইরান ও তার মিত্র হিজবুল্লাহর ওপর অব্যাহত চাপ বজায় রাখাকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য মনে করেন।
ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা, ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর লেবানন সংঘাতকে বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত এবং যুদ্ধবিরতির বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি করেছে। তিনটি আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রের মতে, এসব পদক্ষেপ প্রধান সিদ্ধান্তগুলো থেকে ইসরায়েলকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
আঞ্চলিক একাধিক সূত্র বলেছে, যে দেশটি একসময় নেতানিয়াহুকে একজন অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখত, তারা এখন তাকে এমন এক চুক্তির পথে বাধা হিসেবে বিবেচনা করছে; যা রক্ষা করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ট্রাম্প লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। আর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই সম্পর্কের শর্তের আওতার বিষয়টি তুলে ধরে চুক্তির ইসরায়েলি সমালোচকদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিশ্বে তাদের যে একমাত্র শক্তিশালী মিত্রটি অবশিষ্ট আছে, তারা যেন তাকেই আক্রমণ না করে।
নেতানিয়াহুর চিন্তাভাবনার বিষয়ে অবগত দুজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প এবং ভ্যান্সের এসব প্রকাশ্য মন্তব্য ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতিতে বড় কোনও পরিবর্তন ডেকে আনবে না বলে নেতানিয়াহু মনে করেন।
তবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় তিনি ইসরায়েলের অগ্রাধিকারগুলোকে উপেক্ষা করতে প্রস্তুত। চলতি মাসে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, তিনি যদি নেতানিয়াহুকে কিছু করতে বলেন, তবে তিনি সেটাই করেন।
• হাতছাড়া রিপাবলিকান সুরক্ষা কবচ
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ বলেন, ইরান লেবাননে ইসরায়েলের যেকোনও সামরিক পদক্ষেপকে ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা হিসেবে চিত্রিত করবে। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে তৈরি হওয়া ফাটলকে আরও চওড়া করার চেষ্টা করবে; যা হোয়াইট হাউসকে হয় তার মিত্রকে সমর্থন অথবা চুক্তি টিকিয়ে রাখার মধ্যে যেকোনও একটি বেছে নিতে বাধ্য করবে।
মার্কিন বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহুর অবস্থানকে যা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে, তা হলো তার এতদিনের রাজনৈতিক সুরক্ষা কবচ হারিয়ে যাওয়া।
বছরের পর বছর ধরে তিনি ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের সঙ্গে উত্তেজনা সামাল দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে রিপাবলিকানদের সমর্থনকে কাজে লাগিয়েছেন এবং ২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইরান পারমাণবিক চুক্তির বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসের পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে নিন্দা করেছিলেন। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, রিপাবলিকানরা এবার নেতানিয়াহুর জন্য ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির প্রভাব নেতানিয়াহুর মূল কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর ওপরও পড়ছে। তিনি দুটি লক্ষ্যের ওপর তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাজি ধরেছিলেন। ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত না করলেও দুর্বল এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণের মাধ্যমে সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করা।
এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। সংঘাতের পর ইরানের নেতারা আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। অন্যদিকে সৌদির সঙ্গে হাত মেলানোর বিষয়টি এখনও নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
পুরো অঞ্চলজুড়ে ইতোমধ্যে একটি নতুন হিসাব-নিকাশ দৃশ্যমান হচ্ছে। যে দেশগুলোকে নেতানিয়াহু কাছে টানতে চেয়েছিলেন—যার মধ্যে সৌদি আরব ছিল প্রধান রত্ন; তারা এখন সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া ধীর করে দিয়েছে এবং তেহরানের সঙ্গে সাবধানে পুনরায় আলোচনার পথ খুলছে।
উপসাগরীয় একাধিক সূত্র বলছে, গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীর দখলের অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং উদীয়মান আঞ্চলিক ব্যবস্থায় নেতানিয়াহুর ইসরায়েলকে সম্পদের চেয়ে বড় দায় হিসেবে দেখার প্রবণতা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিয়েছে।
ইরানি এক কর্মকর্তা বলেছেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণের জন্য নেতানিয়াহুর প্রচেষ্টা স্তিমিত হয়ে গেছে এবং কয়েকটি দেশ এখন ইরানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি উদীয়মান ব্যবস্থায় নিজেদের জায়গা খুঁজছে।
তিনি বলেন, এটি কেবল ইরানের বিজয় নয়। এটি নেতানিয়াহুর ব্যর্থতা। ইসলামিক রিপাবলিক (ইরান) কেবল টিকেই থাকেনি; তারা এই অঞ্চলের আরও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স।
এসএস
