বিজ্ঞাপন

ফোন কি মানুষকে বাঁচাতে পারে?

ভূমিকম্পের আগে ভেনেজুয়েলার লাখো মানুষকে সতর্ক করেছে গুগল

ভূমিকম্পের আগে ভেনেজুয়েলার লাখো মানুষকে সতর্ক করেছে গুগল

মাটি কেঁপে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে ভেনেজুয়েলার লাখ লাখ মানুষ তাদের অ্যান্ড্রয়েড ফোনে একটি সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে এই সতর্কবার্তা অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহারকারীদের কছে পৌঁছে যায়। তবে ওই কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানই বিশ্বজুড়ে একটি প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে, প্রকৃতি যখন কোনও আগাম আভাস ছাড়াই আঘাত হানে, তখন প্রযুক্তি কি মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, পারে। তবে এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে। গুগল ভূমিকম্পের কোনও পূর্বাভাস দেয়নি। বরং, গুগলের অ্যান্ড্রয়েড ভূমিকম্প সতর্কতা ব্যবস্থা প্রাথমিক ভূকম্পন শনাক্ত করে এবং আরও বিধ্বংসী কম্পন কাছাকাছি ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছানোর আগেই তাদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয়। এই প্রযুক্তিটি মোশন সেন্সরযুক্ত কোটি কোটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনের ওপর নির্ভর করে; যা মাটির সামান্য নড়াচড়াও শনাক্ত করতে পারে।

এইচআর আনেক্সির বটস ডট এআইয়ের পরিচালক নিখার অরোরা বলেন, ভেনেজুয়েলার এই ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকে যেমনটা ভাবছেন বিষয়টি তেমন নয়। গুগল ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়নি, বরং এটি কম্পনের একেবারে প্রাথমিক লক্ষণগুলো শনাক্ত করেছিল এবং তীব্র ঝাঁকুনি শুরু হওয়ার বেশ আগেই একটি সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দিয়েছিল।

অরোরা বলেন, অ্যান্ড্রয়েড ফোন মূলত একটি বিশাল বিস্তৃত সেন্সর নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে। এগুলোর অ্যাক্সেলেরোমিটার ‌‌‘পি-ওয়েভ’ নামে পরিচিত প্রথম ভূকম্পন তরঙ্গটি শনাক্ত করতে পারে; যা বেশি ধ্বংসাত্মক এস-ওয়েভের চেয়ে দ্রুত পরিভ্রমণ করে।

তিনি বলেন, ‘‘অসংখ্য ডিভাইসে একই ধরনের লক্ষণ শনাক্ত করার মাধ্যমে গুগলের অ্যালগরিদম ভূমিকম্পের স্থান ও মাত্রা সম্পর্কে অনুমান করে এবং আশপাশের সব মানুষকে জানিয়ে দেয়।’’

এর ফলে সতর্কবার্তা পাওয়ার জন্য হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় পাওয়া যায়। কিন্তু যেকোনও জরুরি পরিস্থিতিতে এই সামান্য কয়েক সেকেন্ডও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই সময়ে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো থেকে দূরে সরে যেতে পারে, বিপজ্জনক কাজ বন্ধ অথবা নিরাপদ কোনও স্থানে আশ্রয় নিতে পারে।

• শুধু ভূমিকম্প নয়, অন্যান্য দুর্যোগেও কার্যকর

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার এই অভিজ্ঞতার গুরুত্ব কেবল ভূমিকম্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এনভাইরোকেয়ার ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হৃষিত পানথ্রি বলেন, এই ঘটনা তুলে ধরছে যে, প্রযুক্তি কীভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিকে শক্তিশালী এবং সামাজিকভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে।

তিনি বলেন, ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া অসম্ভব হলেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে তা শনাক্ত এবং ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যু ঠেকাতে যত দ্রুত সম্ভব সেই খবর ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

হৃষিত পানথ্রি বলেন, শহরগুলোর আয়তন যেভাবে বাড়ছে এবং অবকাঠামোগত নেটওয়ার্ক যেভাবে একে অপরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাতে এমন আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা দিন দিন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

‘‘স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার জরুরি মুহূর্তে নাগরিকদের কাছে সরাসরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা তথ্য পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম তৈরি করেছে।’’

তিনি বলেন, দুর্যোগ সহনশীলতাকে কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ঠিক হবে না। সমাজকে ভূমিকম্প, বন্যা, ঝড় এবং তীব্র তাপপ্রবাহসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্যই প্রস্তুতি নিতে হবে।

• উদ্ধারকাজে প্রযুক্তির ব্যবহার

ভেনেজুয়েলার এই সতর্কবার্তা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ঘটতে থাকা একটি বড় পরিবর্তনের কথা মনে করিয়ে দেয়। কেবল ঐতিহ্যগত মনিটরিং স্টেশনগুলোর ওপর নির্ভর না করে, কর্তৃপক্ষ এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলো এখন সাড়া দেওয়ার সময় কমিয়ে আনতে ইন্টারনেট-সংযুক্ত ডিভাইস, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং রিয়েল-টাইম ডেটা নেটওয়ার্কের দিকে ঝুঁকছে।

সরকার, বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই শিক্ষা একেবারেই পরিষ্কার। যদিও কোনও ব্যবস্থার পক্ষেই ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়। তারপরও প্রতিটি সেকেন্ড যখন মূল্যবান, তখন প্রযুক্তি কিছুটা হলেও মূল্যবান সময় এনে দিতে পারে।

বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ ও দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

ভেনেজুয়েলার ফোনগুলো হয়তো মাত্র অল্প কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত সতর্কবার্তা দিয়েছিল। কিন্তু অনেক মানুষের জন্য ওই কয়েক সেকেন্ডই বিপদ ও বেঁচে থাকার মধ্যকার মূল ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি।

এসএস