১৭ বছর বয়সী এক থাই কিশোরী গত বুধবার রাতে উপকূলীয় শহর পাতায়ার পাম গাছে ঘেরা এক প্রাণবন্ত সৈকত এলাকায় ছিল। সেখানে এক বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং তারা কথোপকথন শুরু করে। বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে তারা ওই ব্যক্তির অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসে। এরপর ওই অ্যাপার্টমেন্টে থাই ওই কিশোরীকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর পালিয়ে যায় ঘাতক। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার, ধরা পড়েছে থাই পুলিশের হাতে।
সোমবার থাইল্যান্ডের পুলিশ চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের তথ্য জানিয়েছে বলে খবর দিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে যাওয়ার দুই দিন পর সৈকত থেকে কিছুটা দূরে একটি রেললাইনের পাশে কোমর-সমান উঁচু ঘাসের মাঝে স্যুটকেসের ভেতর থেকে ওই কিশোরীর বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
শনিবার ভোরের দিকে মরদেহ উদ্ধারের প্রায় কাছাকাছি সময় ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে থাই ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এক মধ্যবয়সী অস্ট্রেলিয়ান নাগরিককে আটক করে। থাইল্যান্ড ছাড়ার জন্য একটি ফ্লাইটে ওঠার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়।
থাই পুলিশ বলছে, বর্তমানে হেফাজতে থাকা সাইমন পিটার কারম্যানের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত খুন, মরদেহ গোপন, মরদেহ স্থানান্তর বা ধ্বংস করা এবং অনৈতিক উদ্দেশ্যে কিশোরীকে অপহরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।

পাতায়া নগরী থানার পুলিশ সুপার কর্নেল আনেক সরাথংইউ বলেছেন, দোষী সাব্যস্ত হলে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ১৫ থেকে ২০ বছরের কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন।
তবে এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য কারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। পুলিশ বলছে, সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তি এখনও কোনও আইনজীবী নিয়োগ করেননি।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, থাইল্যান্ডে আটক এক অস্ট্রেলিয়ান নাগরিককে তারা কনস্যুলার সহায়তা দিচ্ছেন এবং এ বিষয়ে আর কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
রঙিন নৈশজীবন আর অবৈধ যৌন পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জনপ্রিয় পাতায়া সৈকতের পুলিশ কর্মকর্তা আনেক বলেছেন, ‘‘কারম্যান আংশিক অপরাধ স্বীকার করেছেন।তিনি বলেছেন, মেয়েটিকে হত্যা করার কোনও উদ্দেশ্য তার ছিল না। তবে তাকে শ্বাসরোধ করার কথা স্বীকার করেছেন। যার ফলে তার মৃত্যু হয়।’’
‘‘তিনি বলেছেন, তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়েছিল এবং ঝগড়ার একপর্যায়ে তিনি ওই কিশোরীকে শ্বাসরোধ করেন।’’
• কালো স্যুটকেস
শনিবার থাই পুলিশের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার দিকে কর্তৃপক্ষ প্রথম একজন নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে জানতে পারে। ওই সময় ভুক্তভোগীর এক বন্ধু পাতায়া সিটি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে বলেন, এক বিদেশি ব্যক্তির সঙ্গে হেঁটে যাওয়ার পর থেকে ওই কিশোরী নিখোঁজ রয়েছে।

তবে এই বিষয়ে প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ খুব বেশি ছিল না। বিবৃতিতে বলা হয়, কেবল এতটুকুই জানা গিয়েছিল, ওই ব্যক্তি তাকে একটি আবাসিক ভবনে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এরপর পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করে এবং একটি অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালিয়ে সন্দেহভাজনের পাসপোর্ট খুঁজে পায়। কিন্তু পুলিশ ওই ব্যক্তি বা মেয়েটির কাউকেই শনাক্ত করতে পারেনি। পাসপোর্ট ছাড়াই কারম্যান কীভাবে দেশ ছাড়ার আশা করছিলেন, তা পরিষ্কার ছিল না।
পুলিশের প্রকাশ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার ভোর ৩টা ৩৫ মিনিটের দিকে জিন্স পরা একটি মেয়ে এবং হাফপ্যান্ট ও কালো হাতাকাটা টি-শার্ট পরা তুলনামূলক দীর্ঘদেহী এক ব্যক্তি হাত ধরাধরি করে একটি লিফটে ঢুকছেন।
কারম্যান পুলিশকে বলেছেন, ঘটনার দিন তিনি বাইরে হাঁটছিলেন। তখন ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার দেখা হয়। তিনি বলেন, তারা কথোপকথন শুরু করে, একসাথে আরও কিছু সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরে তার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসে। পুলিশ কর্মকর্তা আনেক বলেন, পরিবারের একমাত্র সন্তান ওই কিশোরী ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগে পাতায়ায় এসেছিল।
মেয়েটি কেন সন্দেহভাজনের অ্যাপার্টমেন্টে যেতে রাজি হয়েছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং দাতব্য সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই থাইল্যান্ডের ওই এলাকায় যৌন শোষণ, বিশেষ করে শিশুদের ওপর শোষণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

তর্কাতর্কির জেরে ভুক্তভোগীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার পর প্রথমে মরদেহটি স্যুটকেসের ভেতরে রেখেছিলেন কারম্যান। এর কিছু সময় পর তিনি সেটি ভবন থেকে বের করে নিয়ে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দ্বিতীয় একটি সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা যায়, একই ধরনের পোশাক পরা ওই ব্যক্তি একটি বড় কালো স্যুটকেস টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। ভবন, রাস্তার নকশা, লিফট এবং মেঝের ধরন মিলিয়ে দেখে সেটির অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে রয়টার্স। যা আর্কাইভ ও স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গেও মিলে গেছে। স্যুটকেসটিও সেটিই ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরে থাই পুলিশ সেটি উদ্ধার করে এবং এর ভেতরে ভুক্তভোগীর মরদেহ ছিল।
আনেক বলেছেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য এখনও অপেক্ষা করা হচ্ছে এবং তদন্তকারীরা প্রমাণ সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও তদন্তে পাওয়া প্রমাণ প্রসিকিউটরদের কাছে জমা দেওয়া হবে এবং তারাই অভিযোগ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
মেয়েটির সৎ মা ওরাদি বুসারাকুম বলেন, তারা স্যুটকেস উদ্ধারের খবর সংবাদমাধ্যমে দেখার পর সবচেয়ে খারাপ কিছুর আশঙ্কা করেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা আতঙ্কিত ছিলাম। আমরা শুধু আশা করছিলাম আমাদের আশঙ্কা যেন সত্যি না হয়। এখন কাঁদতে কাঁদতে আমাদের চোখ ফুলে গেছে।
সূত্র: রয়টার্স।
এসএস
