এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে গত জুন মাসে ভারত সবচেয়ে শুষ্ক সময় পার করেছে। এর ফলে আসন্ন মৌসুমে কৃষিখাতে চাষাবাদ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বুধবার (১ জুলাই) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
দেশটির আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) জানিয়েছে, গত ১২ বছরের মধ্যে ভারতে জুন মাসে সবচেয়ে শুষ্ক পরিস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। ১৯০১ সাল থেকে দেশব্যাপী বৃষ্টিপাতের হিসাব সংরক্ষণ শুরুর পর থেকে জুন মাসকে পঞ্চমবারের মতো সর্বোচ্চ শুষ্ক মাস শনাক্ত করা হয়েছে।
আইএমডির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে ফসলের বীজ বপনের মৌসুমে কৃষকদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।
সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় জুন মাসের শেষ পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন ফসলের আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ধানের বীজ বপনের পরিমাণও প্রায় এক-চতুর্থাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ভারতে লাখ লাখ কৃষক ফসল বপনের জন্য মৌসুমি বর্ষার ওপর নির্ভর করেন। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষার ধরনে পরিবর্তন এলে তা উৎপাদন ও ফলনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
ভারতের কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৩০ জুন পর্যন্ত কৃষকরা ১ কোটি ৮২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন ফসল বপন করেছেন। গত বছরের একই সময়ে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে ফসল বপন করা হয়েছিল।
ভারতের প্রধান গ্রীষ্মকালীন ফসলের মধ্যে রয়েছে ধান, ডাল, মোটা শস্য, তৈলবীজ, তুলা, আখ ও পাট। এসব ফসল দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ভারতের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ এই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে হয়ে থাকে।
ভারত কেন বর্ষার বৃষ্টির ওপর এতটা নির্ভরশীল?
ভারতের কেরালা রাজ্যে সাধারণত ১ জুন বর্ষার আগমন ঘটে। এরপর এটি ধীরে ধীরে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়। চলতি বছরে বর্ষার আগমন তিন দিন বিলম্বিত হয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিম ভারতের কিছু অংশে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বর্ষার অগ্রগতি মন্থর ছিল। এতে কয়েকটি কৃষিপ্রধান অঞ্চলে জমি প্রস্তুত ও বীজ বপনে বিলম্ব হয়েছে।
প্রকৃতির এ পরিবর্তনের ফলে ধান রোপণের গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কৃষকরা চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ২৫ দশমিক ৮ লাখ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করেছেন। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৪ লাখ হেক্টর। ফলে ধান রোপণ প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে।
ভারতের মোট আবাদি জমির প্রায় অর্ধেকেরই কোনো নির্ভরযোগ্য সেচব্যবস্থা নেই। এসব জমির চাষাবাদ মূলত বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। তাই লাখ লাখ কৃষকের জন্য সময়মতো বর্ষাকাল শুরু হওয়া এবং সারা দেশে এর বিস্তৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপর্যাপ্ত বর্ষার কারণে দেশে তৈলবীজের উৎপাদনও কমে যেতে পারে। ফলে আমদানিকৃত ভোজ্য তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা আরও বাড়বে।
জুন মাসের অস্বাভাবিক শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ফসল চাষের শুরুতেই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আইএমডি জুন মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে ৯২ শতাংশ বৃষ্টিপাতের কথা জানিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই পূর্বাভাসের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আইএমডির মহাপরিচালক মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র বলেন, ১৯০১ সালের পর এটি ছিল ভারতের পঞ্চম শুষ্কতম জুন এবং গত ১২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শুষ্ক। এর চেয়ে ১৯০৫, ১৯২৬, ২০০৯ ও ২০১৪ সালের জুন মাস আরও বেশি শুষ্ক ছিল।
বিবিসি জানিয়েছে, কৃষকরা এখন জুলাই মাসের আবহাওয়ার দিকে নজর রাখছেন। কারণ এটি ভারতের বর্ষা মৌসুমের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল মাস। এ মাসেই মৌসুমি বৃষ্টিপাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়ে থাকে।
সরকার জানিয়েছে, দুর্বল মৌসুমি বায়ু ও সম্ভাব্য এল নিনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বলেছেন, কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের ঝুঁকিতে থাকা ৩১৫টি জেলা চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকার জন্য স্বল্পমেয়াদি ফসল, কম পানিনির্ভর জাত এবং পানি সংরক্ষণসহ জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা কোনো সংকটের জন্য অপেক্ষা না করে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সূত্র: বিবিসি
এমবি
