বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন (৬৩) ২ দশক পর কলকাতায় আসছেন। আগামী ১ আগস্ট একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী শহরে আসছেন তিনি এবং তসলিমার এই আগমনকে ঘিরে ইতোমধ্যে কলকাতার রাজনীতিতে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
কলকাতার রবীন্দ্রসদন মিলনায়তনে হবে এই অনুষ্ঠান। একাধিক সংগঠন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। আয়োজকদের জানিয়েছেন, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। শুভেন্দু তাতে রাজি হয়েছেন।
শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ প্রতিমন্ত্রী স্বপণ দাশগুপ্ত, লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়েরও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকের বিতর্কিত উপন্যাস ‘লজ্জা’ লেখাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের তীব্র বিরোধিতা এবং প্রাণনাশের হুমকির মুখে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। তারপর এক দশক তিনি সুইডেনে কাটান, সেই দেশের নাগরিকত্বও অর্জন করেন। এরপর ২০০৪ সালে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য কলকাতা আসেন তিনি।
কলকাতাভিত্তিক মুসলিমদের একটি অংশ অবশ্য তার এই আসাকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি। ২০০৭ সালে তার উপন্যাস ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশ হওয়ার পর তাদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতার একটি অংশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে উত্তেজনা ছড়ায়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, সেনা মোতায়েন করতে হয়েছিল প্রশাসনকে।
সেই সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তৎকালীন বাম সরকার তসলিমার বিতর্কিত ওই বইটিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কলকাতা ছাড়তে বলা হয় লেখিকাকে। পরে তৃণমূল সরকারের আমলেও তসলিমার উপরে এই অলিখিত ‘নিষেধাজ্ঞা’ বহাল ছিল। কলকাতা ছাড়ার পর তিনি যান দিল্লিতে। সেখানেই এতদিন অবস্থান করেছেন। শাসনক্ষমতায় পালাবদলের পর ফের রাজ্যে আসছেন তসলিমা।
রবীন্দ্রসদনের অনুষ্ঠানের আয়োজক মোহিত রায় বলেন, “তসলিমার এই রাজ্যে আসার ক্ষেত্রে তো কোনও আইনি বাধা নেই। বিগত দু’টো সরকার মৌলবাদের কাছে নতজানু হয়েছিল। এখন নতুন একটি সরকার এসেছে। নতুন আবহে আমরা যারা দীর্ঘদিন তসলিমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখি, তারা ঠিক করলাম তসলিমাকে কলকাতায় আনব।”
মোহিত আরও বলেন, “এই অনুষ্ঠানের নেপথ্যে কোনও রাজনীতি নেই। তসলিমার বিভিন্ন কবিতা ও গান নিয়ে অনুষ্ঠান হবে। তবে তসলিমার নিরাপত্তা একটা বড় বিষয়। সরকারের তরফে তসলিমার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।”
অনুষ্ঠানের আর এক আয়োজক সংগঠন হল ‘সেক্যুলার মিশন’। ওই সংগঠনের তরফে কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী ওসমান মল্লিক সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে লিখেছেন, “দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান...। সকল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে পরাস্ত করে তিনি আসছেন। আমরা তাঁর সংগ্রামের সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।”
অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের পোস্টে তসলিমাকে ‘মৌলবাদ বিরোধী প্রতিবাদের অগ্নিসম প্রতীক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে বলেছেন, “আমি রাজ্য সরকারকে বলেছিলাম, তসলিমা নাসরিনকে যেন পশ্চিমবঙ্গে আনা হয়। কেন তার কণ্ঠকে দাবিয়ে রাখা হবে। বাংলাদেশের একটি হিন্দু পরিবারের ওপর চালানো নির্যাতনকে অবলম্বন করে লজ্জা উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা নিষিদ্ধ করেছে। আমরা তার কলকাতা সফরকে স্বাগত জানাই।”
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অবশ্য তসলিমা নাসরিনের কলকাতা প্রত্যাবর্তনের সমালোচনা করছেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক আখতারুজ্জামান বলেছেন, “দেখুন, তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশ থেকে আসা একজন লেখিকা। তিনি মুসলিম সম্প্রদায় এবং ইসলামি শরিয়তের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছেন। যদি কেউ মুসলিমদের বিরুদ্ধে কথা বলে— সেক্ষেত্রে বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার তাকে স্বাগত জানাবে— এতে কার কি বলার আছে?”
ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) শীর্ষ নেতা এবং বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী বলেছেন, “ বিজেপি বলেছিল, ক্ষমতায় এলে বিনামূল্যে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ দেবে, সবাইকে অন্নপূর্ণা ভান্ডার দেবে। ইশতেহারে বলা কোনও কথা রাখতে পারেনি বিজেপি সরকার। মুসলমানদের টাইট করাটাই উন্নয়ন। তসলিমা নাসরিন মুসলমান-বিদ্বেষী হিসাবেই পরিচিত। বিজেপি সমর্থকরা মরে করে তাকে নিয়ে এলে মুসলমানদের টাইট করা হবে। এটাই উন্নয়ন।”
সূত্র : এনডিটিভি
এসএমডব্লিউ
