২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া বলিউডি ছবি ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর মূল বা নায়ক চরিত্র র্যাঞ্ছোরকে যার আদলে তৈরি করা হয়েছিল, ভারতের সেই জলবায়ু ও মানবাধিকার কর্মী সোনাম ওয়াংচুক একাধিক দাবিতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনশনে বসেছেন।
২৮ জুন শুরু হাওয়া অনশন ২০ দিন পার করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তার সংগ্রামের প্রতি সংহতি জানাচ্ছেন।
কী কারণে অনশন
ওয়াংচুক একাধিক দাবিতে অনশন করছেন। নিট-সহ বিভিন্ন সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য কেন্দ্রের দিকে আঙুল তুলেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি করেছেন। পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে ২০ জন পড়ুয়া আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ। এই পড়ুয়াদের পরিবারকে এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণের দাবিও তুলেছেন শিক্ষাবিদ।
প্রথমে ককরোচ জনতা পার্টি যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করে। তারপরে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন সোনাম। লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা তার অন্যতম দাবি।
আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও ত্রিপুরার উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় এই তফসিল চালু আছে। এর মাধ্যমে জমি, বন ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা-সহ স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ গঠন করা যায়। ২০১৯ সালে জম্মু-কাশ্মীর থেকে আলাদা হয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার পরে লাদাখের উপজাতি জনগোষ্ঠী বিপন্ন হয়ে পড়ছে বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
কলকাতার কী মত
অনশনের ফলে ওজন কমে যাওয়া সত্ত্বেও হার মানছেন না সোনম। ১৮ দিনে আট দশমিক দুই কেজি ওজন কমেছে তার। প্রয়োজনে তিনি ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত অনশন চালাবেন বলে জানিয়েছেন।
ওয়াংচুককে ‘আধুনিক গান্ধী’ তকমা দেয়া হয়েছে। যদিও তা প্রত্যাখ্যান করে অনশনকারী বলেছেন, তিনি একজন সাধারণ নাগরিক। সবাইকে নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।
অনেকেই সরাসরি ওয়াংচুকের ডাকে অনশন মঞ্চে এসে উপস্থিত হচ্ছেন। দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ছাড়া বিজেপি বিরোধী অনেক দলের নেতাই তার সঙ্গে দেখা করেছেন। যারা হাজির হতে পারছেন না, তারা এই শিক্ষাবিদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। কলকাতা থেকেও অকুণ্ঠ সমর্থন পাচ্ছেন সোনম।
মিত্র ইনস্টিটিউশন (মেন)-এর প্রধান শিক্ষক সায়ন্তন দাস ডিডাব্লিউকে বলেন, “সোনমের পাশে আমাদের দাঁড়ানো উচিত। তার দাবির প্রতি নজর দেয়া দরকার সরকারের। নিট-সহ প্রশ্ন সংক্রান্ত যে অনিয়ম দেখা গিয়েছে, যে অন্যায় বা দুর্নীতি দেখা গিয়েছে, সে দিকে নজর দেওয়া উচিত। এগুলোর আশু সমাধানের সদিচ্ছা সরকার যদি না দেখায়, সেটা সমাজের পক্ষে, গোটা দেশের পক্ষে অমঙ্গলের হবে। সোনমের মতো একজন প্রোথিতযশা, নামী মানুষ যে দাবি তুলছেন, সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। সরকার মানে তো শুধু শাসন করা নয়, শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে। তাই সরকারের এ সব দিক খতিয়ে দেখা উচিত।”
মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী, অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র ডিডাব্লিউকে বলেন, “সোনাম শুধু একজন শিক্ষাবিদ নন, তিনি প্রকৃতিপ্রেমী। অনেকে পরিবেশপ্রেমী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন। কিন্তু সোনম সত্যিই প্রকৃতিকে ভালোবাসেন সমাজ, সভ্যতাকে রক্ষার স্বার্থে। তরুণ প্রজন্মের ককরোচ জনতা পার্টির যে সদস্যরা রয়েছেন, তাদের সঙ্গে একাত্মভাবে আন্দোলন করছেন সোনম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও কর্মসূচি নেন, কিন্তু সোনম অন্তর থেকে কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করেন।”
২০১১ সালে আন্না হাজারে যন্তর মন্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনশন করেছিলেন। গত ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার ১৯ দিনে পড়েছে ওয়াংচুকের অনশন। কিন্তু এখনো কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি দেয়া হয়নি।
অম্বিকেশ বলেন, “কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করছেন না। প্রধানমন্ত্রী মুখ খুলছেন না। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হচ্ছে না। এই অবস্থায় সোনমের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়বে। তাই আমি চাই সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। তার কোনো ক্ষতি হলে সেটা সমাজের ক্ষতি হবে। তাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করুন।”
ওয়াংচুকের পাশাপাশি ছাত্র সংগঠন আইসা-র তিন নেতা অনশন করছেন। প্রথমে ছয় জন শুরু করেছিলেন, পরে তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। আন্দোলনকারীদের প্রশ্ন নেতা, খোদ রাজধানীর বুকে চলা এই প্রতিবাদকে কেন উপেক্ষা করছে সরকার?
ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের নেতা, চিকিৎসক অর্জুন দাশগুপ্ত ডিডাব্লিউকে বলেন, “বারবার একটা পরীক্ষা ভেস্তে যাওয়া চরম গাফিলতির পরিচয়। যে শিক্ষামন্ত্রীর আমলে বারবার এই ঘটনা ঘটেছে, তার পদে থাকা উচিত নয়। সোনম আমাদের দেশের একজন কৃতী সন্তান, তিনি আমাদের গর্বিত করেছেন। সমাজের প্রতি যারা অবদান রাখেন, তাদের প্রতি সরকার সহানুভূতি দেখায় না। যারা অবদান রাখেন না, তাদের পাশে দাঁড়ায়।”
সোনামের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে দিল্লি হাইকোর্টে। বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানির পরে আদালত কেন্দ্র ও দিল্লির সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, অনশনকারীর স্বাস্থ্যের প্রতি নিবিড় নজর রাখতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকদের পরামর্শের ভিত্তিতে হস্তক্ষেপও করা দরকার, যেহেতু প্রতিটি জীবন মূল্যবান।
এই আবেদনে মামলাকারী অভিযোগ করেছেন, একজন সন্ত্রাসবাদীর সঙ্গে যে আচরণ করা হয়, সোনামের সঙ্গে সেটাই করা হচ্ছে। কলকাতার প্রার্থনা, সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করা হোক শিক্ষাবিদের দাবিকে।
সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী ডিডাব্লিউকে বলেন, “সোনাম নিজের জন্য অনশন করছেন না, তিনি এই সমাজের স্বার্থে অনশন করছেন। শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগই শুধু বিষয় নয়, আরো কিছু বিষয়ে রয়েছে। সোনামের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই সরকারের উচিত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া।”
“কিন্তু এই পরিস্থিতিতে দেখা গিয়েছে, সরকার বিশেষ হেলদোল দেখায় না। গঙ্গা দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে অতীতে দুজন সন্ন্যাসী অনশন করেছিলেন, ১০০ দিনের বেশি অনশন করে একজন মারা যান। সরকারের এমন অনড় থাকা উচিত নয়।”
এসএমডব্লিউ
