বিজ্ঞাপন

গোপন তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার শিশু-অভিভাবক গ্রেপ্তার

গোপন তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার শিশু-অভিভাবক গ্রেপ্তার

অরোরার ছয় বছর বয়সী কন্যাশিশু কোনও অভিভাবক ছাড়াই একাই যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে পৌঁছায়। সেখানে এই কন্যাশিশুকে একটি অভিবাসী শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়। এরপর অরোরা মেয়েকে কাছে পাওয়ার জন্য টানা ছয় মাস ধরে চেষ্টা করেন।

অবশেষে গত মার্চের শেষের দিকে মা ও মেয়ের পুনর্মিলন ঘটে। তারা আবারও এক ছাদের নিচে আসেন। ২৪ বছর বয়সী অরোরা বলেন, ‌‌‘‘আমরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন টেকেনি। নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন অরোরা।

নথিপত্র অনুযায়ী, এই ঘটনার কয়েক দিন পরই মা ও মেয়েকে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) কর্তৃপক্ষ আটক করে টেক্সাসের একটি পারিবারিক আটক কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ এক নথি পর্যালোচনায় দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনকালে অফিস অব রিফিউজি রিসেটেলমেন্টের (ওআরআর) দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ যে ১২ হাজারের বেশি অভিবাসী শিশু ও তাদের অভিভাবককে গ্রেপ্তার করেছে, অরোরা এবং তার মেয়ে তাদের মাঝে রয়েছে।

যুদ্ধের ভয়াবহতা ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য ১৯৮০ সালে মার্কিন সরকার ওআরআর গঠন করে। এরপর ২০০০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে অরোরার মেয়ের মতো যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে অভিভাবকহীন অবস্থায় আসা শিশুদের আবাসন ও সেবার দায়িত্ব এই সংস্থাকে দেওয়া হয়।

ঐতিহাসিকভাবে দেশটিতে শিশু কল্যাণ সম্পর্কিত এসব কার্যক্রমকে অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে পুরোপুরি পৃথক রাখা হতো। ২০০৮ সালের একটি আইনে বলা হয়েছিল, অভিভাবক বা পৃষ্ঠপোষকের আইনি সুবিধা যেটাই হোক না কেন, শিশুদের দ্রুততম সময়ে নিরাপদ পরিবেশে নিয়ে যেতে এবং তাদের আটকাবস্থা থেকে মুক্তি দিতে হবে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, বেআইনিভাবে অবস্থানকারী অভিবাসী পরিবারগুলো যেন আইসের গ্রেপ্তার বা অভিযানের ভয় ছাড়াই নিজেদের সন্তানদের ফিরিয়ে নিতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অভিভাবকহীন শিশু, তাদের অভিভাবক ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্পর্কে ৪ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি সুনির্দিষ্ট তথ্য ও তথ্যসূত্র আইসের কাছে হস্তান্তর করেছে ওআরআর। ফলে এসব পরিবার বর্তমানে ব্যাপক গ্রেপ্তার ও জোরপূর্বক নির্বাসনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাইডেন প্রশাসনের সময় ওআরআরের ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেন স্মায়ার্স বলেন, আইসের সঙ্গে তথ্য শেয়ার না করার আগে যেসব সুরক্ষা নীতি ছিল, তা এখন সম্পূর্ণ উল্টে ফেলা হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘‘অধিকসংখ্যক মানুষকে দেশ থেকে বিতাড়নের লক্ষ্যেই শিশুরা যে কল্যাণ কর্মসূচির সুবিধা পায়, সেটিকে এখানে হাতিয়ার করা হচ্ছে।’’

রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওআরআর বলেছে, শিশুদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং এ সম্পর্কিত সমস্ত অনুসন্ধানের দায়িত্ব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের (ডিএইচএস)। অন্যদিকে ডিএইচএস বলেছে, অননুমোদিত বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সঙ্গে অতীত সংশ্লিষ্টতা থাকা অভিভাবকদের কাছে যেন শিশুরা না যায় এবং তাদের সুরক্ষার নিশ্চিত করা যায়, সে লক্ষ্যেই আইসকে তদন্তমূলক তথ্য সরবরাহ করেছে ওআরআর।

• আমি কেবল কাজই করি

কাজ ও নিরাপত্তার খোঁজে দুই বছর আগে বেআইনিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন অরোরা। তিনি নিজের ছয় বছরের মেয়েকে মেক্সিকোর গ্রামে স্বজনদের কাছে রেখে এসেছিলেন। কারণ বিপজ্জনক মরুভূমি পার হওয়ার শক্তি তার ছিল না।

অরোরা মিসিসিপিতে মানুষের বাসাবাড়ি পরিষ্কারের কাজ নেন। গত বছরের আগস্টে এক স্বজন তার মেয়েকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেন; যা মূলত পরিবারের সঙ্গে শিশুর পুনর্মিলনের এক প্রচলিত কৌশল। এরপর মেয়েটিকে শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয় এবং অরোরা তাকে নিজের কাছে ফেরত আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেন। ছয় মাস ধরে অরোরা ডিএনএ টেস্টসহ যাবতীয় কাগজপত্র দাখিল করেন। সরকারি নথিতে দেখা গেছে, তার নামে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না।

ট্রাম্প প্রশাসন শিশুদের ছাড়িয়ে নেওয়ার নিয়ম আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর করেছে। বর্তমানে পরিবারের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের আঙুলের ছাপ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে ওআরআরের অভিভাবকহীন শিশুদের আটকে রাখার গড় সময় ২০২৪ অর্থবছরের ৩০ দিন থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ১৯৪ দিনে পৌঁছেছে।

মেয়ের সঙ্গে পুনর্মিলনের আগের দিন আইস কর্মকর্তারা অরোরার বাড়িতে উপস্থিত হয়ে মেয়ের খোঁজখবর নেন এবং পরবর্তী সপ্তাহে আইস অফিসে যোগাযোগের নির্দেশ দেন। অরোরা বলেন, ‘‘তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমার কোনো সমস্যা আছে কি না। আমি বলেছিলাম ‘না, আমি তো কোনো অন্যায় করিনি, দিনরাত কাজই করি’।’’

নথি অনুযায়ী, সেই সাক্ষাতের পর অরোরা ও তার মেয়েকে আটক করে টেক্সাসের ডিলি আটককেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয় আইস। তিন সপ্তাহ সেখানে থাকার পর ছাড়া পান অরোরা। বর্তমানে তার পায়ে একটি ট্র্যাকিং বা এ্যাংকেল মনিটর পরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আদালতের শুনানি চলায় নিয়মিত আইস অফিসে হাজিরা দিতে হচ্ছে। ডিএইচএস অরোরার আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছে, তিনি সীমান্ত পার হয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের কথা স্বীকার করেছেন।

আটক কেন্দ্রে থাকায় মিসিসিপির বাড়িওয়ালা অরোরার সমস্ত জিনিসপত্র ফেলে দিয়ে তাকে উচ্ছেদ করে। এরপর নিরুপায় হয়ে মা ও মেয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় এক বন্ধুর আশ্রয়ে চলে যান। অরোরা বর্তমানে যেকোনো সময় তাদের মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানোর আতঙ্কে আছেন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, রাতের বেলা হঠাৎ মেয়েটা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, ভেবে নেয় ও এখনও আটক কেন্দ্রে আটকে আছে।

সূত্র: রয়টার্স।

এসএস