মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণার এক সপ্তাহ পর দক্ষিণ লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ফি আরোপ করার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। হুথিদের এই ভাবনার বিষয়ে অবগত ওই অঞ্চলের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বুধবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছে।
ইরান-সমর্থিত হুথিরা গত ২০ জুলাই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর মাধ্যমে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে নতুন একটি ফ্রন্ট উন্মুক্ত করেছে হুথি গোষ্ঠী। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরের বাইরের জলসীমায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও অন্যান্য সরঞ্জাম বহনকারী ট্যাংকারের ওপর হামলাও জোরদার করেছে গোষ্ঠীটি।
সূত্রগুলো বলেছে, হুথিরা দক্ষিণ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বেশিরভাগ জাহাজের ওপর ফি নির্ধারণ করার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। নতুন এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা।
তবে এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও হুথিদের মিডিয়া অফিস থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় যোগ দিতে গত জুলাইয়ে ইরানে যান হুথি কর্মকর্তারা। সেখানে ইরানের প্রতিনিধিরা বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর মাশুল আরোপের বিষয়ে হুথি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন বলে রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন তেহরানের কাছ থেকে এই বিষয়ে তথ্য পাওয়া দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা।
সূত্রগুলো বলেছে, আন্তর্জাতিক জলপথে মাশুল আরোপের বিষয়টিকে স্বাভাবিক নিয়মে রূপ দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ানোই হুথিদের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। তবে চীনা জাহাজকে এই মাশুল পরিশোধ থেকে ছাড় দেওয়া হবে এবং হুথিরা এই ব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে।
চীনা তেল ট্যাংকার যেন কোনো ধরনের হামলার শিকার না হয়ে দক্ষিণ লোহিত সাগর পার হতে পারে, সেজন্য হুথিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছে বেইজিং। বিশ্বে সৌদি আরবের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন।
• মাশুল পরিকল্পনায় ইরানি উপদেষ্টাদের নির্দেশনা
তেহরান থেকে বিমানে করে ফিরে আসা হুথি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানি উপদেষ্টারাও ছিলেন। বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচলের মাশুল নিয়ন্ত্রণ ও তা সংগ্রহের জন্য একটি সম্ভাব্য কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে দিকনির্দেশনা দিতে ইরানি কর্মকর্তারা ইয়েমেনে গেছেন বলে জানিয়েছেন আরব অঞ্চলের এক কর্মকর্তা।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জুবা রয়টার্সকে বলেন, হুথিরা লোহিত সাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে এবং তা করতে পারলে তারা অবশ্যই জাহাজগুলো থেকে মাশুল আদায়ের চেষ্টা চালাবে।
এই বিষয়ে পশ্চিমা দুই কূটনীতিক বলেছেন, হুথিদের এই ধরনের পদক্ষেপ পারস্য উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় দেশগুলোর তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়বে। যদিও আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারছে না এবং এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছারও অভাব রয়েছে।
ওমানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির আঞ্চলিক যৌথ ব্যবস্থাপনা এবং জাহাজগুলো থেকে স্বেচ্ছায় মাশুল আদায়ের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তেহরান তা নাকচ করে দিয়েছে বলে বুধবার রয়টার্সকে ইরানের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে এই প্রণালিতে মাসের পর মাস ধরে চলা অচলাবস্থা অবসানের আশা ভেস্তে গেছে; যা পারস্য উপসাগরের বাণিজ্যকে স্থবির করে রেখেছে।
• সৌদি আরবে সরবরাহ সংকটের শঙ্কা
বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথটি ব্যবহার করা থেকে বঞ্চিত হবে এবং বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ইয়েমেন উপকূলে হুথিদের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে জানিয়েছিল গোষ্ঠীটি। গত বছরের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের হামলা বন্ধ হয়েছিল।
গত সপ্তাহে ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জিজান বন্দরের কাছে অন্তত একটি সৌদি তেল ট্যাংকারে হামলা চালানো হয় এবং হুথিরা এই হামলার দায় স্বীকার করেছে।
জাতিসংঘের ২০২৪ সালের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই বছরের সামুদ্রিক অভিযানের চরম পর্যায়ে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর অতিক্রমকারী কয়েকটি শিপিং এজেন্সিকে নিরাপদে পথ অতিক্রম করতে দেওয়ার বিনিময়ে হুথিরা মাশুল আদায় করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। তবে ওই তথ্যের সত্যতা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে সংস্থাটি জানিয়েছিল।
সেই সময় ধারণা করা হয়েছিল, আদায়কৃত এই মাশুলের পরিমাণ মাসে প্রায় ১৮ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। যদিও ওই বিষয়গুলোর বিস্তারিত সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
বাব আল-মানদেব প্রণালি হয়ে এশিয়ায় পণ্যবাহী জাহাজ পৌঁছাতে গড়ে ১৬ দিন সময় লাগে। পণ্যবাহী সব জাহাজকে উত্তর লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে নিয়ে যেতে সময় লাগে প্রায় ৫০ দিন।
সূত্র: রয়টার্স।
এসএস
