পাকিস্তানে এক পর্বত অভিযানের সময় তুষারধসে মারা গেছেন বিশ্বের ১৪টি সর্বোচ্চ পর্বতচূড়ায় দ্রুততম সময়ে জয়ের রেকর্ড গড়া প্রখ্যাত নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুরজা। নেপালি এই পর্বতারোহী ছাড়াও আরও ৯ জন তুষারধসের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন বলে শনিবার তার নিজের প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করেছে।
নির্মল পুরজার পর্বত অভিযানের আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘এলিট এক্সপেড’ ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বলেছে, ‘‘আজ অত্যন্ত গভীর শোক ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমরা নিশ্চিত করছি যে, ব্রড শৃঙ্গে তুষারধসের কবলে পড়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজা।’’
‘‘আমরা নিশ্চিত হয়েছি, ওই অভিযানের অন্যান্য সদস্যরাও দুর্ভাগ্যবশত বেঁচে নেই।’’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানায়নি পর্বত অভিযানের আয়োজক ওই প্রতিষ্ঠান।
৪৩ বছর বয়সী পুরজা এবং অন্য ৯ আরোহী গত বৃহস্পতিবার থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের ৮ হাজার ৫১ মিটার (২৬ হাজার ৪১৪ ফুট) উঁচু ব্রড শৃঙ্গের পর্বতচূড়ায় তুষারধসের কবলে পড়েন তারা। কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত বিশ্বের ১২তম সর্বোচ্চ এই চূড়াটি অত্যন্ত কঠিন এক পর্বত।
পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বলেছেন, পুরজা এবং অন্যান্য পর্বতারোহীদের মরদেহ একটি দুর্গম স্থানে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তাদের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ব্রিটেনের সামরিক বাহিনীর গুরখা রেজিমেন্ট এবং পরবর্তীতে স্পেশাল ফোর্সে দায়িত্ব পালন করা পুরজা ২০১৯ সালে মাত্র ছয় মাসে বিশ্বের ১৪টি সর্বোচ্চ চূড়া জয় করে রেকর্ড গড়েছিলেন। দুই বছর পর তার এই অবিশ্বাস্য যাত্রার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত নেটফ্লিক্স প্রামাণ্যচিত্র ‘‘১৪ পিকস: নাথিং ইজ ইম্পসিবল’’ মুক্তির পর তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে এই ১০ জন পর্বতারোহী তুষারধসের কবলে পড়েন। নিহত ১০ জনের মধ্যে ৬ জন নেপালি এবং বাকিরা পাকিস্তান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নাগরিক।
উদ্ধারকারী দল শুক্রবার তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। সেভেন সামিট ট্রেকসের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ছাং দাওয়া শেরপা বলেন, ড্রোনের ফুটেজের সাহায্যে বাকি মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। তবে সেগুলো এখনো নিচে নামিয়ে আনা যায়নি। সেভেন সামিট ট্রেকসের তিনজন শেরপা গাইডও এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ছাং বলেন, মরদেহগুলো অত্যন্ত দুর্গম জায়গায় রয়েছে এবং এখনো উদ্ধার করা যায়নি। তিনি বলেন, নেপালের মতো পাকিস্তানে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে রশি ঝুলিয়ে পর্বত থেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা প্রচলিত নেই।
‘‘যারা মরদেহ উদ্ধার করতে যাবেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।’’
পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের পর্যটন বিভাগের উপ-পরিচালক সাজিদ হোসেন বলেছেন, উদ্ধার অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। রয়টার্সকে তিনি বলেন, উদ্ধারকারী দল দুর্ঘটনাকবলিতদের অবস্থান সফলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে তারা এখনো মরদেহগুলো উদ্ধার করে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনতে পারেননি।
‘‘মরদেহের অবস্থান নিশ্চিত করা গেলেও উদ্ধার অভিযান এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি।’’
সাজিদ হোসেন বলেন, এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান; যার জন্য উদ্ধারকর্মীদের হেঁটে ও পর্বতারোহণ করে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হবে। তিনি বলেন, ড্রোন নজরদারি এবং আকাশপথের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সঠিক স্থানটি নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও সেখানে পৌঁছে দুর্ঘটনাকবলিতদের নিরাপদে উদ্ধার করে আনা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।
২০১৯ সালে পুরজা বিশ্বের ১০ম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা জয় করেন। এরপর তিনি আট হাজার মিটারের বেশি উঁচুর অন্য পর্বতগুলোতে অভিযান শুরু করেন। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১৪টি পর্বতের মধ্যে ৮টি নেপালে, ৫টি পাকিস্তানে এবং ১টি চীনের তিব্বত অঞ্চলে অবস্থিত।
পর্বতারোহণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এখন পর্যন্ত মাত্র তিন ডজনের কিছু বেশি পর্বতারোহী এই ১৪টি চূড়ার সবগুলোতে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। ব্রড শৃঙ্গকে পাকিস্তানের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং পর্বতারোহণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সূত্র: রয়টার্স।
এসএস
