বিজ্ঞাপন

সেউতায় ২৪ ঘণ্টায় ৬০ হাজার অভিবাসী, নেপথ্যে কী?

সেউতায় ২৪ ঘণ্টায় ৬০ হাজার অভিবাসী, নেপথ্যে কী?

মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সাঁতরে ও স্থলপথে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ ইউরোপের দেশ স্পেনের ছিটমহল সেউতায় প্রবেশ করেছেন। এরপর থেকেই এর কারণ নিয়ে নানা তত্ত্ব ও রাজনৈতিক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে একটি দাবি বারবার সামনে আসছে। সেটি হচ্ছে, স্পেন সরকারের সাম্প্রতিক নিয়মিতকরণ কর্মসূচির কারণেই এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেছেন।

তবে এই দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্কের পক্ষে তথ্য নেই। স্পেনের নিয়মিতকরণ কর্মসূচিতে আবেদন গ্রহণ এক মাসেরও বেশি সময় আগে শেষ হয়েছে। তাছাড়া এই কর্মসূচির আওতায় মূলত এমন অনথিভুক্ত কর্মীরা আবেদন করেছেন, যারা আগে থেকেই স্পেনে বসবাস ও কাজ করছেন এবং যাদের নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়েছে।

অন্যদিকে সেউতায় হঠাৎ অভিবাসীদের ব্যাপক প্রবেশের পেছনে আরও কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত মরক্কো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

শুক্রবার সেউতার কর্তৃপক্ষ বলেছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে সাঁতরে অথবা স্থলপথে সেউতায় প্রবেশ করেছেন।

এই প্রচেষ্টায় অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে শুক্রবার দুপুরের দিকে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সেউতায় প্রবেশকারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ২৫ হাজার মানুষকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে।

• নিয়মিতকরণকে দায়ী করছেন কিছু ইইউ রাজনীতিক

শুক্রবার সকাল থেকেই ইউরোপের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী সেউতায় নজিরবিহীন এই অভিবাসী প্রবেশের সঙ্গে স্পেনের বিশেষ নিয়মিতকরণ কর্মসূচির যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি করছেন।

এ নিয়ে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে ইতালি থেকে। দেশটির কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি দাবি করেছেন, স্পেনের নিয়মিতকরণ নীতি ‘‘মানবপাচারকে উৎসাহিত করেছে’’। এর প্রতিক্রিয়ায় ‘‘ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ’’ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি ‘‘স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তি স্থগিত করার’’ কথাও বলেছেন।

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানি বলেন, সেউতা থেকে আসা ছবিগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, পাঁচ লাখের বেশি অনিয়মিত অভিবাসীকে স্প্যানিশ এবং এর ফলে ইউরোপীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার মাদ্রিদ সরকারের সিদ্ধান্ত কতটা ভুল এবং কীভাবে তা মানবপাচারকে উৎসাহিত করছে।

তায়ানি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জোট মধ্য-ডানপন্থী ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি বা ইপিপিরও একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

ইতালির এই বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন স্পেনের পররাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিষয়ক মন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস। তিনি ‘‘দলীয় রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, ইউরোপীয় সংহতি’’ দাবি করে বলেছেন, তায়ানির বক্তব্যের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার ‘‘কোনো সম্পর্ক নেই’’।

ফ্রান্সেও একই ধরনের বক্তব্য এসেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য এবং ইপিপির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রঁসোয়া-জাভিয়ে বেলামি সেউতায় ব্যাপক অভিবাসী প্রবেশকে স্পেনের নিয়মিতকরণ পরিকল্পনার ‘‘যৌক্তিক পরিণতি’’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এক্সে তিনি লিখেছেন, ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি আবেদন পাওয়ার পর এখন হাজার হাজার বিদেশি সেউতায় স্পেনের সীমান্ত অতিক্রম করছেন।’’

তার মতে, পরিস্থিতিটি ‘‘ফ্রান্স এবং পুরো ইউরোপের জন্য একটি সমস্যা’’।

• নিয়মিতকরণের আবেদন এক মাস আগেই শেষ

তবে স্পেনের নিয়মিতকরণ কর্মসূচি এবং সেউতার বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্কের দাবি তথ্যের সঙ্গে মেলে না।

প্রথমত, স্পেন সরকার এপ্রিলের মাঝামাঝি যে বিশেষ নিয়মিতকরণ কর্মসূচি শুরু করেছিল, সেটির আবেদন গ্রহণ জুনের শেষেই বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রায় এক মাস আগে কর্মসূচিটির আবেদনপর্ব শেষ হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানির দাবি অনুযায়ী, এই কর্মসূচির মাধ্যমে অভিবাসীদের ‘‘স্প্যানিশ এবং এর ফলে ইউরোপীয় নাগরিকত্ব’’ দেওয়া হচ্ছে না।

এই নিয়মিতকরণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী ব্যক্তিরা এক বছরের নবায়নযোগ্য রেসিডেন্স পারমিট বা বসবাসের অনুমতি পেতে পারেন। আবেদনকারীদের বেশিরভাগই আগে থেকেই স্পেনের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অনথিভুক্ত কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের একটি বড় অংশ কয়েক বছর ধরেই দেশটিতে বসবাস করছেন।

আবেদনকারীদের জাতীয়তার তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। মোট আবেদনকারীর প্রায় ২৬ শতাংশ কলম্বিয়ার নাগরিক, যা একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। সব মিলিয়ে প্রতি তিনজন আবেদনকারীর মধ্যে দুজন মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর নাগরিক। অন্যদিকে মরোক্কান নাগরিকদের আবেদন মোট আবেদনের মাত্র ১৩ শতাংশ।

• আবেদন ১২ লাখ, এখন পর্যন্ত অনুমতি পেয়েছেন ১১ হাজার

জুলাইয়ের শুরুতে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত চলা নিয়মিতকরণ কর্মসূচিতে সরকারের প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অনেক বেশি আবেদন জমা পড়েছে।

স্পেন সরকার ধারণা করেছিল, প্রায় পাঁচ লাখ আবেদন যাচাই করতে হবে। কিন্তু দুই মাসেরও কম সময়ে প্রায় ১২ লাখ মানুষ নিয়মিতকরণের জন্য আবেদন করেছেন। বর্তমানে স্পেনের অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে একটি লাল ব্যানারে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, নতুন আবেদন গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।

জমা পড়া সব আবেদন যাচাই করতে কর্তৃপক্ষ আরও তিন মাস সময় রেখেছে। এখন পর্যন্ত মাত্র ১১ হাজার আবেদনকারী এক বছরের রেসিডেন্স পারমিট পেয়েছেন। আরও প্রায় ছয় লাখ মানুষ তাদের আবেদন চূড়ান্তভাবে যাচাই হওয়ার অপেক্ষায় সাময়িক অনুমতি পেয়েছেন।

ফলে স্প্যানিশ প্রশাসনের সামনে এখনো বিপুলসংখ্যক আবেদন যাচাইয়ের কাজ বাকি রয়েছে।

• মরক্কোর বাহিনী প্রথমে যেতে দিয়েছে, পরে সীমান্তে বাধা

সেউতাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এল ফারো দে সেউতা বৃহস্পতিবার দাবি করেছে, তাদের সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলে এমন দৃশ্য দেখেছেন, যেখানে ‘‘মরক্কোর সেনাদের অপ্রাপ্তবয়স্কদের সীমান্ত অতিক্রম করতে উৎসাহিত করতে দেখা গেছে’’।

শুক্রবার স্পেনের কমিউনিস্ট পার্টির সংসদ সদস্য এনরিকে সান্তিয়াগো ঘটনাটিকে মরক্কোর একটি ‘‘উসকানি’’ বলে অভিযোগ করেছেন।

সীমান্তে বাধা শিথিল হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে জড়ো হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে।

ফাতিমা জাহরা নামের এক মরোক্কান নারী এএফপিকে বলেন, আমি তানজিয়ারে ছিলাম, সেখানে কাজ করছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলাম, বুধবার রাত ১০টায় সেউতার সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। বন্ধুদের কাছ থেকে খবরটি পেয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ভাবলাম, আমরাও আমাদের ভাগ্য পরীক্ষা করি।’’

তবে সীমান্তের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই এএফপির সাংবাদিকেরা মরক্কোর পুলিশকে সেউতার সীমান্তের খুব কাছে চলে আসা অভিবাসীদের ঠেকানোর চেষ্টা করতে দেখেছেন।

শুক্রবার সকালে মরক্কোর কর্তৃপক্ষ জলকামান মোতায়েন করে এবং সীমান্তের কাছে যাওয়ার চেষ্টাকারী অভিবাসীদের কয়েক দফা পিছু হটিয়ে দেয় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

ফাতিমা জাহরাও শেষ পর্যন্ত সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠানোর কথা জানিয়েছেন। সেউতা ও মেলিয়া উত্তর মরক্কোতে অবস্থিত স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। এগুলোই আফ্রিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সীমান্ত আবার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষণ দেখা গেলেও অল্প সময়ের জন্য সেখানে বাধা শিথিল হয়েছিল কেন? এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত মরক্কো সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য না থাকায় কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

• সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা বলছে স্পেন

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় স্প্যানিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস বলেছেন, ‘‘আজকের ঘটনার সঙ্গে একটি রায়ের সম্পর্ক রয়েছে।’’

তিনি জুনের শেষ দিকে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি রায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। রায়টি সেউতায় স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে সীমান্তের ওপারে ফেরত পাঠানো বা ‘পুশব্যাক’ সংক্রান্ত।

জুনের শেষ দিকে স্পেনের সর্বোচ্চ আদালত রায় দেয়, সেউতা ও মেলিয়ার উপকূলে সমুদ্র থেকে অভিবাসীদের আটক করে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই মরক্কোয় ফেরত পাঠানো বেআইনি।

আদালতের রায়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় কাউকে আটক করে পূর্ববর্তী কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই মরক্কোয় ফেরত পাঠানোকে ‘‘ক্ষমতার অপব্যবহার’’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে সেউতার স্থানীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের ওই রায় ‘‘সংশোধনের’’ দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত যে সেউতা ও মেলিয়ায় অনুমোদিত প্রবেশপথ ছাড়া স্থল বা সমুদ্র—যেকোনো পথে অবৈধভাবে স্প্যানিশ ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সীমান্তে ফেরত পাঠানোর বিশেষ ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে।

বৃহস্পতিবার থেকে মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সরকার সেউতার সীমান্তে সাধারণ সময়ের তুলনায় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসেবে এই আদালতের রায়ের কথা তুলে ধরছে। ইনফোমাইগ্রেন্টস।

এসএস