বিজ্ঞাপন

৬০ বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর শুল্ক আরোপ

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ অঙ্গরাজ্যের মামলা

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ অঙ্গরাজ্যের মামলা

জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন কিংবা এ ধরনের পণ্য আমদানির অভিযোগে ৬০ বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর যে ১০ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি অঙ্গরাজ্য।

গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক আদালতে (ইউএস কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড) মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

মামলার বাদিপক্ষে রয়েছে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয়েস, ম্যাসাচুসেটস, ওয়াশিংটন, উইসকনসিন, পেনসিলভেনিয়া, কেন্টাকিসহ আরও ১৭টি অঙ্গরাজ্য। এসব অঙ্গরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বিরোধী ধল ডেমোক্রেটিক পার্টি শক্তিশালী।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০টি।

গত জুলাই মাসে ভারত, কানাডা, জাপান, নরওয়ে, তাইওয়ান, চীনসহ ৫৯টি দেশ এবং ইউরোপের দেশগুলোর জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদন এবং এ ধরনের পণ্য আমদানির অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৪ সালে প্রণীত বাণিজ্য আইনের (ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪) ৩০১ নম্বর ধারার অধীনে ১০ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত রপ্তানি শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের পর সে বছর ২ এপ্রিল নতুন শুল্কনীতি ঘোষণা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই নীতি অনুযায়ী ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রণীত জরুরি অর্থনীতি আইনকে (ইন্টারন্যাশনাল ইমরার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্ট- আইইপিএ) ভিত্তি করে  যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে— এমন সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ ‘বেইসলাইন শুল্ক’ আরোপের পাশাপাশি ‘পাল্টাপাল্টি শুল্ক’ (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) আরোপ করেন তিনি।

পুরো ২০২৫ সালজুড়ে চীন, ভারত, কানাডা, মেক্সিকো, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের সময়ে ‘পাল্টাপাল্টি শুল্ক’-কে (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) হাতিয়ার হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

চলতি ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এক রায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। রায় ঘোষণার সময় মার্কিন সর্বোচ্চ আদালত বলেছিলেন, এতদিন ইন্টারন্যাশনাল ইমরার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্ট, ১৯৭৭ আইনটি বিধি বহির্ভূতভাবে ব্যবহার করে আসছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে এই আইনের আওতায় যে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে— তা অবৈধ। পরে একই যুক্তিতে ৭ মে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ‘বেইসলাইন’ শুল্কও বাতিল ঘোষণা করেন সুপ্রিম কোর্ট।

গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতে মামলা দায়েরর পর এক বিবৃতিতে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস জানান, যে ৬০ বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন— যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সব ধরনের পণ্যের ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ আসে সেসব দেশ এবং অঞ্চল থেকে।

বিবৃতিতে সুপ্রিম কোর্টের শুল্ক বাতিলের রায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে লেটিশিয়া জেমস বলেন, “সুপ্রিম কোর্টে হেরে যাওয়ার পর ফের নতুন করে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও মার্কিন পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর বাড়ানোর চেষ্টা করছে।”

“এখন ট্রাম্প প্রশাসন এই শুল্ক আরোপকে ন্যায্যতা দিতে অনেক কথা বলবে, কিন্তু আমাদের আইন এবং সংবিধানে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার খেয়াল-খুশি অনুযায়ী কোনো দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারেন না।”

মামলা দায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের এই অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আইনসম্মত ক্ষমতা ব্যবহার করে এমন সব অযৌক্তিক কাজ, নীতি ও কার্যকলাপ দূর করছে যা মার্কিন বাণিজ্যের ওপর বোঝা সৃষ্টি করে।”

দেশাই আরও বলেন, “জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে কোনো বিদেশি দেশের ব্যর্থতা অযৌক্তিক এবং এটি মার্কিন শ্রমিকসহ মার্কিন বাণিজ্যের ওপর বোঝা সৃষ্টি করে, যার সমাধান করা আবশ্যক। প্রেসিডেন্টের প্রথম মেয়াদ থেকেই ধারা ৩০১-এর শুল্ক একটি আইনগতভাবে টেকসই হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে এবং এখনও তা-ই আছে।”

এদিকে মামলা দায়েরের পর নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন জোরপূর্বক শ্রমকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ব্যাপক শুল্ক আরোপ সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ানকে হোকুল বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবৈধ শুল্ক সাধারণ কর্মজীবী বা খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর ওপর কর ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রশাসনের এই শুল্কনীতির কারণে মুদিপণ্য, গৃহস্থালীর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, নির্মাণ সামগ্রী এবং সাধারণ মার্কিনীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দৈনন্দিন পণ্যগুলোর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।”

ক্যাথরিন আরও বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যে এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শুল্ক আরোপের নামে আইনকে উপেক্ষা করা যাবে না।”

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান, টাইমস অব ইন্ডিয়া

এসএমডব্লিউ