ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এ দিন লাখো বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় তিনি পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এর মাধ্যমে তার ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনের সমাপ্তি ঘটে। শেখ হাসিনার পতনের ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছিল।
এ দিন বিবিসির শিরোনামে বলা হয়েছিল, ‘শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশে উচ্ছ্বাস।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক সপ্তাহের প্রাণঘাতী বিক্ষোভের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। এ ঘটনার মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে তার দুই দশকেরও বেশি সময়ের আধিপত্যের অবসান ঘটেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৭৬ বছর বয়সী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে অবতরণ করেছেন। তার পতনের খবরে উল্লসিত জনতা রাস্তায় নেমে আসে।
এতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে আটক সব শিক্ষার্থীকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন।
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের শিরোনামে বলা হয়, ‘পদত্যাগ করে দেশ ছাড়লেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, নিশ্চিত করলেন সেনাপ্রধান।’ এতে বলা হয়, স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন বলে জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দেশের জন্য এক সংকটময় সময়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। এ সময় তিনি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা জানান।
সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমি এখন দায়িত্ব নিচ্ছি এবং আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য অনুরোধ করব, যা এই সময়ের মধ্যে দেশকে নেতৃত্ব দেবে।’
২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ শাসন করে আসা ৭৬ বছর বয়সী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে দেশ ত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রাস্তায় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জনতার মধ্যে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআরের শিরোনামে বলা হয়, ‘হাজারো ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে শেখ হাসিনার পতন, ১৫ বছরের শাসনের অবসান।’ এতে বলা হয়, হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সামরিক বাহিনীর জারি করা কারফিউ অমান্য করে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করলে তিনি ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে পদত্যাগ করেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমে তাকে তার বোনের সঙ্গে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে উঠতে দেখা গেছে। এর কিছুক্ষণ পর বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির নির্দেশনা চাওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করবে না এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের জন্ম দেওয়া প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের বিষয়ে তদন্ত শুরু করবে। তিনি শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য নাগরিকদের কাছে সময় চান।
সেনাপ্রধান বলেন, ‘সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রাখুন। আমরা সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করব এবং দায়ীদের শাস্তি দেব। আমি নির্দেশ দিয়েছি, কোনো সেনাসদস্য বা পুলিশ সদস্য কোনো ধরনের গুলিবর্ষণে লিপ্ত হবে না।’
বার্তাসংস্থা এপির শিরোনামে বলা হয়, ‘ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে হামলা,শেখ হাসিনার পদত্যাগ।’
এতে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। পরে এটি প্রধানমন্ত্রীর ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হলে তিনি পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে যান। এ সময় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী তাঁর সরকারি বাসভবন এবং তাঁর দল ও পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ভবনে হামলা চালায়।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনের শিরোনামে বলা হয়, ‘সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা বাসভবনে হামলা চালালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতে পালিয়ে যান।’
এতে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে কয়েক সপ্তাহের প্রাণঘাতী সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনে হামলা চালালে তিনি পদত্যাগ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলে যান।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করবে।
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের যা দাবি, আমরা তা পূরণ করব এবং দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনব। দয়া করে এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করুন। সহিংসতা থেকে দূরে থাকুন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনী কারও ওপর গুলি চালাবে না, পুলিশও কারও ওপর গুলি চালাবে না। আমি নির্দেশ দিয়েছি।’
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের শিরোনামে বলা হয়, ‘দেশ ছাড়লেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা জানাল সেনাবাহিনী।’
এতে বলা হয়, সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এবং পরে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে পরিণত হওয়া বিক্ষোভ দমনে শত শত মানুষ নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যান।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের শিরোনামে বলা হয়, ‘পদত্যাগ করে দেশ ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ১৫ বছরের শাসনের অবসান।’ এতে বলা হয়, সোমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। এর মাধ্যমে তাঁর ১৫ বছরের ক্ষমতার অবসান ঘটেছে। এ দিন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সামরিক বাহিনীর জারি করা কারফিউ অমান্য করে তাঁর সরকারি বাসভবনে হামলা চালায়।
সামরিক বাহিনী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ খবর নিশ্চিত করেন। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগের পর জাতিসংঘ শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের আহ্বান জানায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের শিরোনামে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ: গণবিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার পদত্যাগ।’
ওই সময়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, সপ্তাহব্যাপী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যান। এ ঘটনায় আনুমানিক ৩০০ জন নিহত, হাজার হাজার মানুষ আহত এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হন।
প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করার সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘আমি আপনাদের সবাইকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব।’
এমবি
