টানা কয়েক দশক ধরে শরণার্থী শিবিরে ‘বন্দি’ থাকা এবং বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকার পর অবশেষে ভাগ্য খুলতে শুরু করেছে থাইল্যান্ডের আশ্রয় নেওয়া মিয়নমারের শরণার্থীদের। গত জুলাই মাস থেকে মিয়ানমারের শরণার্থীদের অ-নাগরিক পরিচয়পত্র ও বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ দিচ্ছে থাই সরকার।
সামরিক বাহিনী এবং জাতিস্বত্ত্বাভিত্তিক সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত থেকে বাঁচতে গত কয়েক দশক ধরে সীমান্ত পেরিয়ে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিচ্ছেন থাই সীমান্তবর্তী বার্মিজ প্রদেশগুলোর বাসিন্দারা। বর্তমানে থাইল্যান্ডের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাস করছেন মিয়ানমারের প্রায় ৮০ হাজার নাগরিক।
গত জুলাই মাস থেকে এই শরণার্থীদের অ-নাগরিক থাই পরিচয়পত্র প্রদান করছে থাইল্যান্ডের সরকার। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাকি শরণার্থীদেরও শিগগিরই কার্ড প্রদান করা হবে।
পরিচয়পত্র প্রদানের পাশাপাশি শরণার্থী ক্যাম্পের বার্মিজ তরুণ-তরুণীদের বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে এই তরুণ-তরুণীদের কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ বা নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন।
থাইল্যান্ডের প্রাচিনবুরি প্রদেশের শরণার্থী ক্যাম্পে এ পর্যন্ত মোট ১৫ জনকে অ-নাগরিক পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। গেই লাহ নামের এক তরুণী এই ১৫ জনের মধ্যে অন্যতম। ১২ বছর আগে সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতের সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে পালিয়ে থাইল্যান্ডের শরণার্থী শিবিরে যখন আশ্রয় নেন গেই, সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর।
কার্ড পাওয়ার পর নির্মাণ শ্রমিকের কাজ পেয়েছেন তিনি। এএফপিকে গেই বলেন, “আমি কঠোর পরিশ্রম করতে চাই, টাকা জমাতে চাই এবং সেই টাকা দিয়ে একটি জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে বাবা-মাকে সেখানে রাখতে চাই। আপাতত এটুকুই আমার স্বপ্ন।”
সিত নেইন আয়ে নামের এক তরুণও শৈশবে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছিলেন এবং জীবনের বেশিরভাগ সময় আরেকটি সীমান্ত শিবিরে 'দুর্দশার মধ্যে' কাটিয়েছেন। পরিচয়পত্র পাওয়ার পর নির্মাণ শ্রমিকের কাজ পেয়েছেন তিনিও। ২৭ বছর বয়সী এই তরুণ এএফপিকে বলেন, “জীবনে এই প্রথম আমি নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে গড়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমি অবশ্যই তা কাজে লাগাব।”
থাই সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণর্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরও। সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি, সুরক্ষা এবং আত্মনির্ভরশীলতার জন্য এটি থাইল্যান্ডের সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।”
এদিকে থাইল্যান্ডের বেশ কয়েক জন কৃষি খামার মালিক এবং শিল্প উদ্যোক্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এক সময় শ্রমসাধ্য কাজের জন্য পার্শ্ববর্তী কম্বোডিয়া থেকে আসা শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করতেন তারা; কিন্তু গত বছর জুলাই মাসে সীমান্ত নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর কম্বোডিয়া থেকে আসা শ্রমিকদের বেশিরভাগই নিজ দেশে ফিরে গেছেন। এই সংখ্যা প্রায় লাখের কাছাকাছি
কম্বোডীয় শ্রমিকদের এই আকস্মিক বিদায়ের ফলে থাইল্যান্ডের শ্রমবাজারে সৃষ্ট সংকট থেকে উত্তরণের জন্যই মিয়ানমারের শরণার্থীদের কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছেন দেশটির উদ্যোক্তারা। মানাস লোহসুয়ান নামের এক থাই কৃষি খামারমালিক এএফপিকে বলেন, “কম্বোডিয়ার শ্রমিকরা অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিল। তাদের পারিশ্রমিকও ছিল চড়া। অন্যদিকে মিয়ানমারের শ্রমিকরা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় বেশ খানিকটা পিছিয়ে আছে; এ কারণে পারিশ্রমিকবাবদ আমাদের ব্যয় কমেছে।”
শরণার্থী শিবিরে জন্ম ও বড় হওয়া ২৫ বছর বয়সী নেই লা জাও জীবনে এই প্রথম কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। একটি কৃষি খামের শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। এএফপিকে জাও বলেন, “আমি কাজ করতে চাই। কাজ করতে আমার কোনো ক্লান্তি লাগে না।”
সূত্র : এএফপি, এনডিটিভি
এসএমডব্লিউ
