বিজ্ঞাপন

ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবীকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ

ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবীকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবী টড ব্লাঞ্চকে দেশটির নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন সিনেট। শনিবার সকালের দিকে সিনেটে এক ভোটাভুটিতে দেশটির নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল পদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেটরের ভোট পেয়েছেন টড ব্লাঞ্চ।

রিপাবলিকান দলীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির বিচার বিভাগকে ইচ্ছেমাফিক পরিচালনা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। নিজের ব্যক্তিগত সহকারী দেশটির বিচারবিভাগের সর্বোচ্চ পদে আসীনের মাধ্যমে সেই প্রচেষ্টা সুসংহত করলেন তিনি।

দেশটির সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে ৫০-৪৯ ভোটের ব্যবধানে ব্লাঞ্চের মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছে। গত বছর ট্রাম্প পুনরায় হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ব্লাঞ্চ দ্বিতীয় অনুমোদিত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেলেন। শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করার স্পষ্ট আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন ট্রাম্প।

ব্লাঞ্চ আগে থেকেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে মার্কিন বিচার বিভাগ পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে সিনেটের এই আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের এজেন্ডা আরও আগ্রাসীভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেন তিনি।

সিনেটে দীর্ঘ এক উত্তপ্ত বিতর্কের পর ওই ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ অনুগত ব্যক্তিকে বিচার বিভাগের শীর্ষে বসানো নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটরও চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। হোয়াইট হাউসের প্রভাব মুক্ত ও স্বাধীন থেকে কাজ করার এক ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগের।

শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত সূক্ষ্ম ব্যবধানে জয় পান ব্লাঞ্চ। তার বিপক্ষে ভোট দেন দেশটির মেন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর সুসান কলিন্স এবং আলাস্কার সিনেটর লিন্ডসে মারকাউস্কি নামের দুই রিপাবলিকান সিনেটর।

অ্যাটর্নি জেনারেলের পদে ব্লাঞ্চের অনুমোদনের পথ মসৃণ ছিল না। ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিসের (আইআরএস) বিরুদ্ধে ট্রাম্পের দায়ের করা একটি মামলার বিতর্কিত সমঝোতা প্রস্তাব নিয়ে স্বয়ং রিপাবলিকানদের মধ্যেই চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।

চাপের মুখে পড়ে ব্লাঞ্চ লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হন, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটলে হামলাকারীসহ ট্রাম্পের সহযোগীদের জন্য প্রস্তাবিত ১.৮ বিলিয়ন (১৮০ কোটি) ডলারের ক্ষতিপূরণ তহবিল বাতিল করবে বিচার বিভাগ। পাশাপাশি ট্রাম্প ও তার পরিবারকে আইআরএসের কর নিরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার যে বিতর্কিত ধারা সমঝোতায় ছিল, সেটিও তিনি সংশোধন করবেন।

ব্লাঞ্চের এই প্রতিশ্রুতি রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডির আস্থা অর্জনে সফল হয়। শুক্রবার সকালে ব্লাঞ্চের পক্ষে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি; যা জয় নিশ্চিত করতে সবচেয়ে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখে। ক্যাসিডি বলেন, ট্রাম্পের অধীনে বিচার বিভাগ পরিচালনার জন্য ব্লাঞ্চের চেয়ে যোগ্য কাউকে হয়তো পাওয়া যেত না। ট্রাম্পের সাবেক ফৌজদারি প্রতিরক্ষা আইনজীবী হওয়ার কারণে প্রেসিডেন্টের অযৌক্তিক নানা দাবি ও চাপ সফলভাবে সামলাতে ব্লাঞ্চ আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।

ক্যাসিডি‌‌‌‌‌‌‌‌ বলেন, এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর কোনো গণভোট নয়, বরং বিশেষ একটি পরিস্থিতিতে ব্লাঞ্চের যোগ্যতার ওপর নেওয়া সিদ্ধান্ত। চলতি বছর রিপাবলিকানদের দলের প্রাথমিক বাছাইয়ে ট্রাম্প সমর্থিত এক প্রার্থীর কাছে হেরে যান এই সিনেটর।

অন্যদিকে সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য ও ইলিনয়ের সিনেটর ডিক ডারবিন বলেন, ব্লাঞ্চকে অ্যাটর্নি জেনারেল করা হবে এক মারাত্মক ভুল। সিনেটরদের ইতিহাসের ভুল পক্ষে না থাকার আহ্বান জানান তিনি।

ডারবিন বলেন, আমাদের ইতিহাসের ঠিক এই মুহূর্তেই এমন একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ও নিষ্কলঙ্ক অ্যাটর্নি জেনারেল দরকার; যিনি সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের দুর্নীতি দূর করতে পুরোপুরি নিবেদিতপ্রাণ থাকবেন।

দীর্ঘ এক তিক্ত লড়াই শেষে অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে মূলত ট্রাম্পের প্রতি ব্লাঞ্চের অন্ধ আনুগত্যের বিষয়টিই সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

গত এপ্রিলে অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডিকে বরখাস্ত করেন ট্রাম্প। এরপরই ব্লাঞ্চকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে বিচার বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব নিয়েই ট্রাম্পের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠেন তিনি।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত জোরদার এবং সেই বহুল বিতর্কিত আইনি সমঝোতার ঘোষণা দেন ব্লাঞ্চ। যে চুক্তির মাধ্যমে অপরাধ বিচার ব্যবস্থায় ভুক্তভোগী দাবি করা ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দিতে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড গঠন এবং ট্রাম্প ও তার পরিবারকে কর নিরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এই সমঝোতা প্রস্তাব ব্লাঞ্চের নিয়োগ আটকে দেওয়ার উপক্রম তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে টেক্সাসের সিনেটর জন কর্নিন এবং নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিসের মতো প্রভাবশালী রিপাবলিকানদের চাপে লিখিতভাবে ওই তহবিল বাতিল করেন তিনি। বিচার বিভাগের সাথে রিপাবলিকানদের এই সমঝোতার পর চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটিতে ব্লাঞ্চের ভোট গ্রহণের পথ উন্মুক্ত হয়।

তবে এই সমঝোতার পরও ব্লাঞ্চকে কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটরের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়; যারা শুরু থেকেই কর নিরীক্ষার ছাড় এবং অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড গঠন নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন।

শুক্রবার ভোরে সিনেটর মারকাউস্কি ঘোষণা দেন, তিনি ব্লাঞ্চের মনোনয়নের বিরোধিতায় কলিন্সের সাথে যোগ দেবেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন একজন অ্যাটর্নি জেনারেল প্রয়োজন যিনি বর্তমান প্রশাসনের সবচেয়ে বাজে প্রবণতা ও হঠকারী সিদ্ধান্তগুলোকে লাগাম টেনে ধরবেন।

নিউইয়র্কের সাবেক এই ফেডারেল প্রসিকিউটর প্রথম পরিচিতি পান ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করার পর। নিউইয়র্কে ট্রাম্পের চাঞ্চল্যকর তথ্য গোপন রাখার অর্থ প্রদান মামলায় তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের নেতৃত্ব দেন। এছাড়া বাইডেন প্রশাসনের সময় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি ফেডারেল ফৌজদারি মামলাতেও তিনি ট্রাম্পের হয়ে আইনি লড়াই চালান।

পরবর্তীতে ব্লাঞ্চ দাবি করেন, এই দুটি মামলা লড়ার অভিজ্ঞতাই তাকে স্বচক্ষে দেখিয়েছে কীভাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

গত বছর প্যাম বন্ডির অধীনে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্রথম বিচার বিভাগে পদার্পণ করেন ব্লাঞ্চ। বিভাগের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিতর্কিত বিলিয়নেয়ার জেফরি এপস্টাইন সংক্রান্ত লাখ লাখ তদন্ত ফাইল প্রকাশের মতো হাই-প্রোফাইল ও সংবেদনশীল বিষয়ে তিনিই ছিলেন প্রধান মুখপাত্র।

ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কোমির মতো ট্রাম্পের শত্রুদের বিরুদ্ধে তদন্ত ত্বরান্বিত করে এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এনে ব্লাঞ্চ মূলত ট্রাম্পের প্রতি নিজের চরম আনুগত্যই প্রকাশ করেছেন। বন্ডি ও ব্লাঞ্চের আমলে গণছাঁটাই, পদত্যাগ কিংবা স্বেচ্ছায় অবসরের কারণে বিভাগটি হাজার হাজার অভিজ্ঞ কর্মী হারিয়েছে।

তবে ব্লাঞ্চের সমর্থকদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, একজন সফল ফেডারেল প্রসিকিউটর হিসেবে তার অভিজ্ঞতা এবং আদালতে ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করার ক্ষমতা প্যাম বন্ডির চেয়ে তাকে আরও বেশি যোগ্য করে তুলেছে। এর ফলে হোয়াইট হাউসের যেকোনো অবৈধ বা আইনি সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ট্রাম্পকে সরাসরি বোঝানোর সাহস তার থাকবে। এছাড়া সহিংস অপরাধ কমানো, অবৈধ অভিবাসন রোধ এবং সীমান্তজুড়ে মাদক চোরাচালান ও কার্টেল দমনে ব্লাঞ্চের কঠোর পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেন রিপাবলিকান নেতারা।

ভোটাভুটির ঠিক আগে সিনেটের বিচারবিষয়ক কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান চক গ্রাসলি ব্লাঞ্চকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেন, তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিচার বিভাগ পরিচালনা করেছেন এবং তিনিই এই পদের জন্য সঠিক পছন্দ।

তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিশোধের ইচ্ছা পূরণে ব্লাঞ্চ কতটুকু সফল হবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ তার পূর্বসূরি প্যাম বন্ডি যখন ট্রাম্পের একের পর এক শত্রুদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণে বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন, তখন বিচারক, গ্র্যান্ড জুরি এবং বিভাগের অভ্যন্তরীণ প্রসিকিউটরদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। যার জের ধরেই শেষ পর্যন্ত বন্ডিকে ছাঁটাই করেন ট্রাম্প।

ভারপ্রাপ্ত প্রধানের পদ নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ট্রাম্পকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে সাবেক এফবিআই প্রধান জেমস কোমিকে অভিযুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে দেশটির বিচার বিভাগ। ৪৭তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করে ঝিনুক দিয়ে ‌‌‌‌‌‌‌‘‘৮৬ ৪৭’’ লিখে সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন কোমি। যদিও কোমির আইনজীবীরা মিথ্যা তথ্য প্রদান, নথিপত্রে ভুল তথ্য উপস্থাপন এবং মূল তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলাটি খারিজের আবেদন জানিয়েছেন।

এদিকে, ফ্লোরিডায় এক নতুন তদন্ত তদারকির জন্য রেগান প্রশাসনের সাবেক প্রসিকিউটর জোসেফ ডি জেনোভাকে নিয়োগ দিয়েছেন ব্লাঞ্চ। গত এক দশকে দেশটির সাবেক আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত বা পর্যুদস্ত করার কোনো চক্রান্তে লিপ্ত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এই তদন্তে। তবে এই তদন্ত থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

সূত্র: সিএনএন।

এসএস