বিজ্ঞাপন

অবৈধ প্রবেশের দায়ে যুক্তরাজ্যে সহস্রাধিক অভিবাসী দণ্ডিত

অবৈধ প্রবেশের দায়ে যুক্তরাজ্যে সহস্রাধিক অভিবাসী দণ্ডিত

যুক্তরাজ্যে ২০২২ সাল থেকে অবৈধ উপায়ে প্রবেশের অভিযোগে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি অভিবাসী দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে নির্যাতন ও মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ব্রিটেনের তথ্য অধিকার আইনের আওতায় প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ছোট নৌকায় চ্যানেল পেরিয়ে অথবা লরিতে চড়ে অর্থাৎ অনিয়মিত উপায়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ নিরুৎসাহিত করতে ২০২২ সালে অবৈধ প্রবেশ-সংক্রান্ত অপরাধের বিধান চালু করে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে সে সময় এই সিদ্ধান্তের ব্যাপক সমালোচনা হয়। কারণ শরণার্থী বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আসা ব্যক্তিদের কীভাবে তারা ভ্রমণ করেছেন, সেই কারণে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অনিরাপদ দেশ থেকে নিরাপদ দেশে বৈধভাবে যাওয়ার সুযোগ তাদের থাকে না।

ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের গবেষক ও অপরাধবিজ্ঞানী ড. ভিক্টোরিয়া টেইলর তথ্য অধিকার আইনের আওতায় যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।

সেখানে দেখা গেছে, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ‘ইলিগ্যাল অ্যারাইভাল’ আইনে ১ হাজার ১০৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬২৮ জন উত্তর ফ্রান্স উপকূল থেকে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছিলেন। এর মধ্যে ২৯৬ জনকে নজরদারি ড্রোনের ভিডিওতে নৌকা চালাতে দেখা গেছে। অন্যদের কেউ কেউ এর আগে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন-সংক্রান্ত নথিভুক্ত ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

একই সময়ে ছোট নৌকা চালিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পারাপারে সহায়তার অভিযোগে ‘ফ্যাসিলিটেশন’ নামে পৃথক অপরাধে মাত্র ১২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যক্তি নৌকা চালানোর পাশাপাশি পুরো যাত্রা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; এমন প্রমাণ সংগ্রহ করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের জন্য তুলনামূলক কঠিন। তাই তাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিলিটেশনের পরিবর্তে ইলিগ্যাল অ্যারাইভালের অভিযোগ আনা সহজ হয়।

তদন্তে দেখা গেছে, বিভিন্ন কারণে অনেককে নৌকার হাল ধরতে হয়েছে। কেউ আগে নৌকা চালানোর অভিজ্ঞতা থাকায়, কেউ যাত্রার খরচ কমানোর বিনিময়ে, কেউ পালাক্রমে, আবার কেউ অস্ত্রের মুখে বাধ্য হয়ে নৌকা চালিয়েছেন।

এমনই একটি মামলায় দক্ষিণ সুদানের মানবপাচারের শিকার এক ব্যক্তিকে বন্দুকের মুখে ছোট নৌকা চালাতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে ওই মামলায় বিচারিক পর্যালোচনার আবেদন নিষ্পত্তির সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মত হয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য আরও শক্তিশালী সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

ওই ব্যক্তির পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ডেইটন পিয়ার্স গ্লিনের এমিলি সুথিল এএফপিকে বলেন, ‘‘আমাদের মক্কেলের ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখায়, মানবপাচারের সম্ভাব্য শিকার ব্যক্তিদের নিয়মিতভাবেই ইলিগ্যাল অ্যারাইভালের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এবং তাদের অনেক মাস কারাগারে থাকতে হচ্ছে।’’

তিনি বলেন, আমাদের মক্কেলের মামলায় সরকারের দেওয়া আশ্বাস প্রমাণ করে, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের ভুলভাবে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের আধুনিক দাসত্ববিরোধী আইনি কাঠামো আরও দৃঢ় ও ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা জরুরি।

বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নির্যাতন ও মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিরাও ছিলেন। এছাড়া তাদের মধ্যে বয়স নিয়ে বিরোধ থাকা অন্তত ৩০ জন শিশুও ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৯ জনকে প্রাপ্তবয়স্কদের কারাগারে রাখা হয়েছিল।

ক্যাপ্টেন সাপোর্ট ইউকে নামের একটি সংগঠন ইলিগ্যাল অ্যারাইভাল মামলায় কারাবন্দি শত শত মানুষের সঙ্গে কাজ করেছে। সংগঠনটির দাবি, গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই এসব ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন।

সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, ‘‘এসব মামলার কারণে মানুষ ও তাদের পরিবারের ওপর কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, আমরা তা সরাসরি দেখছি। নিরাপত্তা ও ভালো জীবনের সন্ধানে যাত্রা করা মানুষদের কারাগারে পাঠানো অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। নিরাপত্তার খোঁজে আসার কারণে কাউকে কারাগারে যেতে হওয়া উচিত নয়।’’

ড. ভিক্টোরিয়া টেইলর বলেন, ‘‘কার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে, সেই প্রক্রিয়াটি ইচ্ছামতো পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি নিষ্ঠুর।’’

তিনি বলেন, ২০২২ সালের পর ‘ইলিগ্যাল অ্যারাইভাল’-এর অভিযোগে কারাবন্দি হওয়া অধিকাংশ মানুষ গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। তাদের অনেকেই পরে আশ্রয় পেয়েছেন, আবার অনেককে মানবপাচারের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ উভয় স্বীকৃতিই পেয়েছেন। ইনফোমাইগ্রেন্টস।

এসএস