তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সদ্য গঠিত প্রতিরক্ষা জোটের পরিধি আরও বাড়াতে চায় আঙ্কারা। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের বরাত দিয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। শনিবার তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে হাকান ফিদান বলেছেন, ‘‘আমাদের প্রেসিডেন্টের দূরদর্শী ভাবনায়, এই উদ্যোগ কেবল তিনটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। আমাদের পরিধি আরও বিস্তৃত করা এবং প্রয়োজনে সব দেশকেই এই ছাতার নিচে নিয়ে আসা উচিত।’’
এর আগে, শুক্রবার তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তায় নতুন আঞ্চলিক কাঠামোতে রূপ নিতে পারে।
এই জোটে পরবর্তী সময়ে আর কোন কোন দেশ যুক্ত হতে পারে এবং জোটের সম্প্রসারণ পুরো অঞ্চলের সুরক্ষায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?
• কী আছে এই চুক্তিতে?
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এক বছর আগে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির এক সম্প্রসারিত রূপ। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, সম্মিলিত নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিরোধের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দেশকেও এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
এই চুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অনুকরণে তৈরি একটি শর্ত; যেখানে জোটের যেকোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এই চুক্তির বিস্তারিত সামরিক রূপরেখা এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি।
তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের কাছে কী ধরনের, কতটুকু এবং কীভাবে সহায়তা চাইবে, তা আলোচনার ভিত্তিতে ঠিক করা হবে। তবে চুক্তিভুক্ত কোনো দেশে আগে হামলা না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো দেশকে প্রতিপক্ষ বা হুমকি হিসেবে ধরা হবে না।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুর্কি ও সৌদি কর্মকর্তারা বলেছেন, এই চুক্তি অন্য কোনো কৌশলগত জোট বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থলাভিষিক্ত বা খর্ব করার জন্য করা হয়নি। একইসঙ্গে চুক্তিটি ইরানসহ কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি বলেও জানিয়েছে আঙ্কারা।
• পরবর্তীতে যুক্ত হতে পারে কোন কোন দেশ?
চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী তিন দেশের দায়িত্বশীল সূত্রের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যে দেশের নাম উঠে এসেছে, সেটি হলো মিসর।
মিসরকে এই জোটের এক স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে ফিদান বলেন, কারিগরি জটিলতাগুলো কেটে গেলেই কায়রো আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগ দেবে বলে তিনি আশাবাদী।
‘‘আমি বিশ্বাস করি, পরবর্তী ধাপে মিসরও আমাদের সঙ্গে এই জোটে শামিল হবে। আমরা ইতোমধ্যে পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে কাজ করছি, যেন আমরা একই জোটের অংশ।’’
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক অধ্যাপক আলী বাকির বলেন, কায়রো জোটে যুক্ত হলে এর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, আঞ্চলিক প্রভাব ও সামরিক কার্যকারিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।’’
• মিসরের বাধা কোথায়?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মিসরের কূটনৈতিক ও কৌশলগত মেলবন্ধন বেশ পুরোনো। আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনার জন্য এই চার দেশ মিলে গঠিত ‘আর-ফোর’ প্ল্যাটফর্মেরও অংশ মিসর। ২০১৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির পতন, লিবিয়া সংকট এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার নিয়ে আঙ্কারার সঙ্গে তিক্ততা থাকলেও সম্প্রতি তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বেশ জোরদার করেছে কায়রো।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যেসব দেশের সব স্বার্থ মিসরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে না, তাদের সঙ্গে বাধ্যতামূলক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে গেলে কী ধরনের সামরিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে কায়রো কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকতে পারে। এছাড়া তাদের বিদ্যমান শান্তি চুক্তিগুলোর ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়েও সতর্ক কায়রো।
থিংক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির সহযোগী ফেলো করিম এলগেন্ডি বলেন, ‘‘মিসর কেবল তখনই যোগ দিতে পারে, যদি চুক্তির শর্তাবলী ওয়াশিংটনের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তার সম্পর্ককে বিঘ্নিত না করে, অন্যান্য বিদ্যমান জোট বা শান্তি চুক্তি বজায় রাখে এবং স্বাধীনভাবে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখে।’’
‘‘যদি এটি কেবল একটি রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে থাকে, যেখানে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ রয়েছে, তাহলে কায়রো হয়তো শেষ পর্যন্ত সই করবে। কিন্তু এটি যদি বাধ্যতামূলক কোনো সামরিক চুক্তিতে রূপ নেয়; যা মিসরীয় বাহিনীকে অন্যের যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে বাধ্য করতে পারে, তখন উত্তরটি ‘না’-ই হবে।’’
মিসরের যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু আইনি ও সামরিক-পরিচালনগত জটিলতাও রয়েছে বলে মনে করেন এলগেন্ডি। তিনি বলেন, আইনি দিক থেকে মিসরকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তারা ঠিক কী রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছে। তাছাড়া আঙ্কারার পক্ষ নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অঙ্গীকার, লিবিয়া বা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে জড়িয়ে পড়ার মতো ইঙ্গিত যাতে এই চুক্তিতে না থাকে, কায়রো সেটাও নিশ্চিত করতে চাইবে।
আলী বাকিরের মতে, কায়রোর সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তারা এই জোটের কৌশলগত সুবিধার পাশাপাশি সম্ভাব্য কূটনৈতিক জটিলতাগুলোকে কীভাবে সামলাচ্ছে তার ওপর। কায়রো এই জোটে যুক্ত হওয়াটা তাদের জন্য কতটা লাভজনক মনে করছে এবং তাদের জাতীয় স্বার্থের বিরোধী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখছে; তার ওপরই সব নির্ভর করছে।
চ্যাথাম হাউসের আরেক সহযোগী ফেলো আহমেদ আবুদুহ বলেন, মিসর এই জোটের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোর সঙ্গে একমত হলেও আঞ্চলিক হুমকিগুলোকে তারা তুর্কি বা সৌদির দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে না। ফলে তারা কৌশলগত কোনো সামরিক দায়বদ্ধতায় জড়াতে কিছুটা দ্বিধাবোধ করতে পারে।
‘‘কায়রোর মূল ঝোঁক থাকে সুনির্দিষ্ট ও সীমিত ইস্যুকে কেন্দ্র করে গঠিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে থাকার... উচ্চ ঝুঁকি ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা দায়বদ্ধতায় জড়ানোর ক্ষেত্রে নয়।’’
তিনি বলেন, মিসর ভবিষ্যতে এই জোটে যুক্ত হতেও পারে। কিন্তু সেটি হবে তাদের জন্য অত্যন্ত এক জটিল সিদ্ধান্ত।
• জোটে যোগ দিতে পারে আর কোন কোন দেশ?
জোটের সম্প্রসারণ নিয়ে গুঞ্জনের মধ্যে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোও শেষ পর্যন্ত এই জোটে শামিল হতে পারে।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জসিম আল থানি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সব সদস্য দেশই এই জোটে যোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেবে। সৌদি আরব ছাড়া জিসিসির অন্য সদস্যরা হলো কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিদানও অন্যান্য আঞ্চলিক দেশকে যুক্ত করার কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, ইতোমধ্যেই কিছু দেশ জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদিও এসব দেশের নাম প্রকাশ করেননি তিনি। ফিদান বলেন, ‘‘আমাদের প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, কেবল তিন দেশেই সীমিত না থেকে এই জোটকে আরও বড় করা এবং প্রয়োজনে সব দেশকে এই ছাতার নিচে আনা।’’
জোটে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়ে করিম এলগেন্ডি বলেন, প্রথমেই যাদের দিকে নজর থাকবে, তারা হলো কাতার ও কুয়েত। এই দুটি দেশই মূল তিন দেশের খুবই ঘনিষ্ঠ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি অনুভব করায় অতিরিক্ত সুরক্ষা বলয় নিশ্চিত করতে চাইছে তারা।
একইভাবে অধ্যাপক বাকিরও মনে করেন, কাতারই এই জোটে যোগ দেওয়ার সবচেয়ে স্বাভাবিক দাবিদার। আর কুয়েত হতে পারে পরবর্তী প্রার্থী। এছাড়া আজারবাইজান, সিরিয়া ও জর্ডানও তুলনামূলক দ্রুত সময়ে এই জোটে যুক্ত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তবে শেষ পর্যন্ত এই জোট কোনো সার্বজনীন ব্লকে পরিণত হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন এলগেন্ডি। তিনি বলেন, এটি আসলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার তাগিদে গঠিত ইচ্ছুক দেশগুলোর জোট, যা তাদের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ ও ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা।
এসএস
