ভোটের ফলের পর প্রথম জেলা সফরে গিয়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে পড়লেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, পুলিশ তাদের কর্তব্য পালন করেছে।
১৫ বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর গত তিন মাসে যে ক’টি রাজনৈতিক কর্মসূচি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছেন, সবই ছিল কলকাতায়। রোববার প্রথমবার কলকাতা থেকে বের হন তিনি । বেরিয়েই হেনস্থার শিকার হন।
উত্তর ২৪ পরগনার বীজপুরের রাস্তায় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ দেখিয়েছে একদল লোক। কেউ গাড়িতে ছুড়েছেন কাদা, কেউ জুতো এবং তার সঙ্গে ‘চোর-চোর’ স্লোগান।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মতে, স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষেই এমনটা হয়েছে। তিনি আরও বলছেন, যা হয়ছে সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু এটি তৃণমূল কংগ্রেসের ‘কর্মফল’।
এর আগে ভোট-পরবর্তী ‘অশান্তি’ মামলায় কলকাতা হাই কোর্টে আইনজীবী হিসাবে সওয়াল করতে গিয়ে হেনস্থার মুখে পড়েছিলেন তখন মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সদ্য প্রাক্তন হওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; কিন্তু রোববার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তাকে নজিরবিহীন বলা চলে। বস্তুত, গত ৪ মে ভোটের ফল বার হওয়ার পর এই প্রথম কোনও জেলাসফরে যান মমতা। উদ্দেশ্য ছিল থানা হেফাজতে রহস্যজনক ভাবে মৃত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।
কিন্তু উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ার পথে একাধিক বার বাধার মুখে পড়তে হয় তিন বারের মুখ্যমন্ত্রীকে। তাঁকে উদ্দেশ্য করে ‘ওই দেখো চোর এসেছে’ বলে স্লোগান দিতে থাকে একদল। সেখানেই শেষ নয়, মমতার সাদা রঙের গাড়ির দিকে ধেয়ে আসে ছেঁড়া জুতো। ছোড়া হয় কাদা। মমতার অভিযোগ, ইট-পাটকেলও ছোড়া হয়েছিল। নেহাত গাড়ির জানলা বন্ধ ছিল। নইলে মারাই যেতেন তাঁরা!
মমতার সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের দুই সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দোলা সেন। তাঁদের ঘিরে স্লোগান দেওয়া হয়। যদিও এ সবের মধ্যে মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন মমতারা।
বিজেপির অভিযোগ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উস্কানি দিতে এসেছিলেন বীজপুর-কাঁচরাপাড়ায়। সাধারণ মানুষ তার প্রতিবাদ করেছে। অন্য দিকে, মমতা তোপ দাগেন রাজ্য সরকারকে। পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও নিশানা করেন তিনি। মমতা বলেন, ‘‘বিজেপি গুন্ডাদের দিয়ে এই কাজ করিয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘নিরাপত্তা ভুলে যান। লুম্পেনদের প্রোটেকশন দিচ্ছে পুলিশ! বাংলা তো লুম্পেনদের হাতে চলে গিয়েছে। আমরা কেস করব।’’ তিন বারের মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, তার গাড়িতে বড় বড় ইটের টুকরো ছোড়া হয়েছে। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, ‘‘জানলা বন্ধ না থাকলে আমার মাথা ফেটে যেত। এখানে আমরা মরে যেতাম। পুলিশ বিজেপিকেই প্রোটেকশন দিচ্ছে।’’ শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বলেন, ‘‘শুভেন্দু অধিকারী পুলিশ দিয়ে রাজত্ব চালাচ্ছেন। মাফিয়াদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন।’’ এর পর বীজপুরের রাস্তা দিয়ে কলকাতা ফেরার সময় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি কার্যত ঘিরে রেখে বার করতে হয় পুলিশকে।
পরে মমতা বলেছেন, “গাড়িতে প্রচুর ইট ছোড়া হয়েছে। এত ইট মেরেছে যে কল্পনা করতে পারবেন না।’’ তার অভিযোগ, এক ঘণ্টা গাড়ি আটকে রেখেছিল ‘বিজেপির লোকজন’। পর ক্ষণেই তার সংযোজন, “আমি বেরোবই। বিজেপি ভয় পায় আমায়। এই ভাবে আমায় আটকাতে পারবে না…ওরা ভয় পাচ্ছে কারণ ওদের মুখোশ খুলে যাবে।”
উল্লেখ্য, তোলাবাজি-সহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে কাঁচরাপাড়া পুরসভার তৃণমূলের পদত্যাগী কাউন্সিলর জেনি শর্মা কেওটের স্বামী বিরজু কেওটকে গ্রেফতার করেছিল হালিশহর থানার পুলিশ। শুক্রবার তাকে আদালতেও হাজির করানো হয়েছিল। বিচারক তার পাচ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন।
কিন্তু শনিবার জানা যায়, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে কাঁচরাপাড়া পুরসভার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর জেনি শর্মা কেওটের স্বামীর। জেনির অভিযোগ, লকআপের ভেতরে পুলিশের মারধরে তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের তরফে এই ঘটনায় কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। রোববার মমতা কেওটের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে বলেন, “এ রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বলে আর কিছু নেই।” তার আরও অভিযোগ, মৃতের পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে বিজেপি।
মমতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রথম প্রতিক্রিয়া দেন বীজপুরের বিজেপি বিধায়ক সুদীপ্ত দাস। তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরনো রাজনীতি এটাই। শকুন যেমন লাশ খোঁজে, উনিও খোঁজেন পশ্চিমবঙ্গের কোনও মৃত্যু নিয়ে কী ভাবে সংবাদমাধ্যমে থাকা যায়। কারণ, উনি রাজনীতিতে এখন অপ্রাসঙ্গিক। পাড়ার ছেলে এবং বিধায়ক হিসেবে মৃতের পরিবারের পাশে আছি আমি। আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি পরিবারের সঙ্গে। যাদের বাড়িতে এটা হয়েছে, তারা কিছু বলছেন না। তারা আমাদের উপর ভরসা রেখেছেন। লকআপে মৃত্যু নিয়ে আইনি সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত আমরা। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতি খুঁজতে বেরিয়েছেন।”
মমতার গাড়িতে ইট-পাথর ছোড়ার অভিযোগ নিয়ে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “যদি কেউ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে পাথর, কাদা বা চপ্পল ছোড়ে, তবে বিজেপি তাদের সমর্থন করে না। এই ঘটনায় কোনও বিজেপি কর্মী জড়িত নন এবং আমরা চাই না যে রাজ্যের প্রাক্তন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি এমন আচরণ করা হোক। এমনটা হলে ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গেরই মুখ কালো হবে। আমরা এই ঘটনার নিন্দা জানাই এবং যদি এমনটা ঘটে থাকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর অধীনস্থ পুলিশ এর বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেবে।”
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানান, ওই বিক্ষোভে বিজেপির কেউ ছিল না। জনরোষের স্বীকার হয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তার কথায়, “উনি জ়েড প্লাস ক্যাটেগরি (নিরাপত্তা) পান। আমরা উইথড্র (প্রত্যাহার) করিনি। ডিরেক্টর অফ সিকিউরিটির সিনিয়র অফিসার এখানে আছেন।” বলে পিছনের দিকে আঙুল দেখান মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি আবার বলেন, ‘‘আমি পুলিশকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোনও যোগাযোগ করা হয়েছিল? তারা বলেছেন, যোগাযোগ করা হয়নি। আমি টিভি-তে যেটুকু ছবি দেখেছি, সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের নেতৃত্বে পুলিশ তাকে সাপোর্ট দিয়েছে।”
মমতার ওই সফর নিয়ে কটাক্ষ করে শুভেন্দু বলেছেন, ছুটির দিনে (রোববার) আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়েছেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রী এ-ও বলেন, ‘‘উনি (মমতা) পুলিশকে জানাননি। এই নিরাপত্তা পাওয়ার (যোগ্য) কি না, সন্দেহ আছে। আমাদের উপর অবশ্য নির্দেশ রয়েছে... ১৫ বছরের মুখ্যমন্ত্রী। বয়সও হয়েছে। যতটা সম্ভব পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া এবং সম্মান রাখা উচিত। পুলিশ সেই কাজ করেছে। পুলিশ খারাপ কিছু করেনি।”
মমতা ‘পরামর্শ’ দেওয়ার মতো করে শুভেন্দু বলেন, “উনাকে বলব, আপনাকে ওই বাড়ির লোক দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। আর আপনি বলছেন, ‘না! আমি দরজা ভেঙে ঢুকব।’ এই কাজগুলো করবেন না।” তিনি আরও বলেন, “কেউ আপনার সাহায্য চাইলে, হস্তক্ষেপ চাইলে অবশ্যই করুন। কিন্তু উন্নয়নের সময় অহেতুক এমন করবেন না।’’
শুভেন্দুর সংযোজন, “এত চুরি করেছেন, চোর তো শুনতে হবে। হেলিকপ্টারে উঠলে কানে লাগিয়ে দেয় না... (হেডসেট বা নয়েজ-ক্যানসেলিং ইয়ারফোন বলা হয়। এটি দেখতে হেডফোনের মতো তবে গান শোনার জন্য নয়। প্রবল শব্দ থেকে যাত্রীর কান রক্ষা করে) ওগুলো লাগিয়ে নিন। এত বিপুল জনরোষ! আজ তো অভয়ার বাড়িতে গলায় গামছা নিয়ে যেতে পারতেন। বলতে পারতেন, ‘রত্নাদি ক্ষমা করে দিন’! হয়তো উনি ক্ষমা করতে পারতেন। কিংবা করতেন না, জানি না।”
যদিও শুভেন্দুর মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য অগ্নিমিত্রা পালের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। মমতাকে বিক্ষোভ দেখানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘হোয়াট ইজ় দিস? উনার অনেক দোষ থাকতে পারে, তাই বলে জুতো-কাদা ছুড়বেন?’’
অন্য দিকে, মমতার গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভের প্রতিবাদে সোমবার রাজ্য বিধানসভায় প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন কালীঘাট তৃণমূলের মুখপাত্র তথা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ। দলের বিধায়কদের কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকার বার্তা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে কুণালের ইঙ্গিত, দলীয় নেত্রীর অপমানের দিনে যারা অনুপস্থিত থাকবেন, তাদের দলের সঙ্গে প্রতারণা করা এবং চাটুকারিতার শামিল বলেই গণ্য করবে রাজ্যের মানুষ।
সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “সোমবার ১০ অগস্ট দুপুর দু’টোর সময় রাজ্য বিধানসভা ভবন চত্বরে সর্বসম্মত ভাবে তৃণমূল বিধায়করা বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। তৃণমূলনেত্রী তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর উপর ঘটা ঘটনার বিরুদ্ধে সুর চড়াতেই এই প্রতিবাদী জমায়েত।”
