বিজ্ঞাপন

ন্যাটোর আদলে মক্কা চুক্তি, মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যের আহ্বান পাকিস্তানের

ন্যাটোর আদলে মক্কা চুক্তি, মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যের আহ্বান পাকিস্তানের

পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর আদলে একটি যৌথ সামরিক পরাশক্তি গড়ে তুলতে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান। অভ্যন্তরীণ মতভেদ ভুলে এই চুক্তিতে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকেও যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ।

পাকিস্তানের প্রভাবশালী গণমাধ্যম জিও নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ বলেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনো এক্সক্লুসিভ ক্লাব বা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না।

তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের জন্য এই চুক্তির দরজা কখনোই বন্ধ রাখা হবে না। এই জোট কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেশের কোনো ব্যক্তিগত গোষ্ঠীর হওয়া উচিত নয়; এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত। এর পরিধি আরও বাড়াতে হবে।

‘‘আমার মনে হয়, ন্যাটোর মতো করে মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার ছোটখাটো মতভেদ, লেনদেনসংক্রান্ত ইস্যু কিংবা দ্বিপাক্ষিক সব বিরোধ দূরে সরিয়ে রাখা এবং সবাই মিলে এই একটি যৌথ প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ানো উচিত।’’

এর আগে, গত শুক্রবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ঐতিহাসিক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে এক নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি হতে চলেছে।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সংঘাতের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো যেভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে; তাতে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এই তিন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চরম উত্তেজনার মাঝেই নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদারে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নতুন এই প্রতিরক্ষা চুক্তি এক বছর আগে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত পূর্ববর্তী চুক্তির ওপর ভিত্তি করেই স্বাক্ষরিত হয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, এটি কৌশলগতভাবে ন্যাটোর বহুল আলোচিত ‘অনুচ্ছেদ ৫’-এর মতোই প্রায় একই ধরনের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি।

চুক্তির প্রধান শর্তে বলা হয়েছে, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা চালানো হলে তা তিন দেশের ওপরই যৌথ হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে চুক্তির বিস্তারিত ধারা এখনো পুরোপুরি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির দেশ তুরস্ক বলেছে, সদস্য দেশগুলোর ওপর হামলা হলে মিত্ররা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করবে, তারা কী পরিমাণ এবং কীভাবে পরস্পরকে সহায়তা করবে। তবে যতক্ষণ না কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশকেই প্রতিপক্ষ বা হুমকি হিসেবে দেখা হবে না।

এই ত্রিদেশীয় সামরিক জোটের সদস্য তিন দেশেরই ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সক্ষমতা রয়েছে। পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘদিনের বাস্তব যুদ্ধকৌশলের অভিজ্ঞতা এবং এটি মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। অন্যদিকে সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব। আর ন্যাটো সদস্য তুরস্কের রয়েছে বিশাল সুসজ্জিত সেনাবাহিনী এবং বিশ্বমানের নিজস্ব আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্প।

কেবল পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ নন, আঞ্চলিক অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও বলেছেন, সম্মিলিত এই যৌথ নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশকেও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও এই সামরিক জোটকে আরও বিস্তৃত দেখতে চান এবং এ ক্ষেত্রে মিসরসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ সম্ভাব্য নতুন সদস্য হতে পারে।

দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, এই নতুন জোট ইরান বা নির্দিষ্ট কোনো দেশের বিরুদ্ধে গঠিত হয়নি; বরং এটি তিন মিত্র দেশের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখার একটি সাধারণ প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার মাত্র।

এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার বলেছেন, নতুন এই প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি এবং আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের জন্য এই জোটে যোগ দেওয়ার পথ খোলা রয়েছে।

তিনি বলেন, চুক্তিটি সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষামূলক কাঠামোর ওপর তৈরি। যেসকল দেশ এর মূলনীতিগুলো মেনে চলতে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের বিরোধ মিটিয়ে নিতে ইচ্ছুক, তারা এই জোটে অনায়াসে যোগ দিতে পারে। দার বলেন, এই চুক্তি কৌশলগত নিরাপত্তা জোরদারে তিন দেশের সম্মিলিত ইচ্ছারই প্রতিফলন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে পাকিস্তানের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি এবং স্থিতিশীলতা আনায় পাকিস্তানের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তিনি লেখেন, এই মক্কা চুক্তি তিন দেশের বিদ্যমান অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ও বহুপক্ষীয় চুক্তি কিংবা অন্য কোনো দেশ ও সংস্থার সাথে থাকা চুক্তির ওপর কোনো ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াবে না এবং সেগুলোকে বাতিলও করবে না।

সূত্র: জিও নিউজ।

এসএস