বিজ্ঞাপন

তালেবানের কঠোর বিধিনিষেধ

ঘর থেকে বের হতে পারছেন না অর্ধেক আফগান নারী

ঘর থেকে বের হতে পারছেন না অর্ধেক আফগান নারী

আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের নানামুখী কঠোর বিধিনিষেধের কারণে স্বাধীনভাবে চলাচল কিংবা সামাজিক জীবনে নারীদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। বর্তমানে দেশটির প্রায় অর্ধেক নারী মাসে মাত্র এক বা দু’বার ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ পান। বুধবার জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার (ইউএন উইমেন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। 

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসেই আফগানিস্তানের ক্ষমতায় দ্বিতীয় দফায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে তালেবানের। এ উপলক্ষে লিঙ্গ সমতা নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের ওই অঙ্গসংস্থা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানই বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ; যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা এবং নারীদের উচ্চশিক্ষার ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এক বিবৃতিতে ইউএন উইমেন বলেছে, ২০২১ সালের আগস্টে ক্ষমতা দখলের পর গত পাঁচ বছরে তালেবান সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাদের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার হরণ করেছে। আধুনিক বিশ্বে এটি এক নজিরবিহীন ও ব্যতিক্রমী ঘটনা।

তবে নারীদের নিরাপত্তা ও চলাফেরা সংক্রান্ত এসব দাবি অস্বীকার করেছে আফগান সরকার। তালেবানের সদাচার প্রচার ও পাপ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাইফ-উল-ইসলাম খাইবার রয়টার্সকে বলেছেন, নারীরা বাইরে বের হতে অনিরাপদ বোধ করছেন; এমন দাবি সঠিক নয়। দেশের সব নারীই তাদের প্রাপ্য অধিকার ভোগ করছেন।

তিনি বলেন, গত প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথম আফগানিস্তানের সব নাগরিক পরম নিরাপত্তা ও শান্তিতে বসবাস করছেন। একই সঙ্গে দেশটির নারী অধিকার পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে, জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) বলেছে, ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রায় ২৪ লাখ আফগান কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

ইউএন উইমেন আরও জানায়, ক্ষমতায় আসার পর থেকে তালেবান কর্তৃপক্ষ নারী ও মেয়েদের লক্ষ্য করে ১০০টিরও বেশি নীতি ও আদেশ জারি করেছে। এর মাধ্যমে নারীদের ওপর বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক এবং পরিস্থিতিকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ নারী অধিকার সংকটে রূপ দেওয়া হয়েছে।

যদিও তালেবানের দাবি, তারা ইসলামি শরিয়াহ আইন এবং স্থানীয় আফগান সংস্কৃতির নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ীই নারীদের অধিকার প্রদান করছে।

জাতিসংঘের সংস্থাটির জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি নারী বলেছেন, তারা মাসে দু’বার বা তার চেয়েও কম বাইরে যান। পাশাপাশি প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নারী জানিয়েছেন, কোনো পুরুষ অভিভাবক বা মাহরাম ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

এই চরম আইনি ও সামাজিক কড়াকড়ি আফগান নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। একাকীত্ব, সুযোগের অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কথা জানিয়ে জরিপে অংশ নেওয়া ১০ জনের মধ্যে ৭ জন নারীই তাদের মানসিক অবস্থাকে খারাপ বা খুব খারাপ বলে বর্ণনা করেছেন।

সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, সম্প্রতি তালেবানের নেওয়া বেশ কিছু আইনি পরিবর্তন নারীদের সুরক্ষাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। চলতি বছর কার্যকর হওয়া নিয়মগুলোর মাধ্যমে আইনের চোখে নারী-পুরুষের সমান অধিকার বাতিল, বৈবাহিক সম্পর্কে পুরুষের একক কর্তৃত্ব বৃদ্ধি এবং নারীদের জন্য তালাক নেওয়ার পথ অত্যন্ত কঠিন করে তোলা হয়েছে।

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকেও নারীদের প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। ইউএন উইমেনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে কর্মক্ষম পুরুষের ৮৪ শতাংশ কাজ করলেও নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৭ শতাংশ।

সংস্থাটি বলেছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সরেজমিন জরিপে ২ হাজার ১৯০ জন এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে ২ হাজার ৮১১ জন নারীর টেলিফোন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স।

এসএস