পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে দাবি করে দ্রুত সুচিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি। একই সঙ্গে ইমরান খানের দুশ্চিন্তা, বুক ধড়ফড় করা ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আলভি বলেছেন, ইমরান খানের মেডিকেল রিপোর্টগুলো সত্যিই উদ্বেগজনক। আমি একাধিক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে এসব রিপোর্ট নিয়ে কথা বলেছি। সাধারণ মানুষ যেন আসল পরিস্থিতি সঠিকভাবে বুঝতে পারেন, তাই এটি সহজ ভাষায় উপস্থাপন করছি।
তিনি লিখেছেন, ‘ইমরান খানের দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, বুক ধড়ফড় করা এবং উচ্চ রক্তচাপ’ তাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করেছে। তিনি বলেন, রিপোর্টে অনিদ্রার কথা সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, তিনি যেসব ওষুধ সেবন করছেন তা থেকে এই সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
‘‘আমি ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইমরান খানকে চিনি। মানসিক চাপ কখনোই তার দুর্বলতা ছিল না। এটি এখন চরমে পৌঁছেছে; এই বিষয়টিই স্পষ্ট করে দেয় তিন বছরের কারাবাস এবং পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন জীবন তার ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’’
আলভি বলেন, পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সহকর্মীদের কারাবাস, সাজাপ্রাপ্ত ও নিহতদের অবস্থা এবং বাইরের পত্রিকা, বই বা তথ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখাই ইমরান খানের এই মানসিক চাপের মূল কারণ।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর হৃদস্পন্দনের হার নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইমরানের ঐতিহাসিকভাবে কম থাকা বিশ্রামকালীন হৃদস্পন্দনের হার বেড়ে এখন প্রতি মিনিটে ৫৪ বিটে (বিপিএম) পৌঁছেছে।
‘‘তার হৃদস্পন্দনের হার ৫৪ বিপিএম। চিকিৎসকরা একে স্বাভাবিক বলতে পারেন। তবে তার শারীরিক গঠনের ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক নয়,’’ জানিয়ে আলভি বলেন, ইমরান খান নিজেও বুক ধড়ফড় করার কথা জানিয়েছেন।
দেশটির সাবেক এই প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইমরান খানের অবিলম্বে ২৪ ঘণ্টার একটি হোল্টার মনিটর প্রয়োজন এবং তার রক্তচাপ প্রতিদিন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
তিনি স্ট্রেস টেস্ট, ইকোকার্ডিওগ্রাম, কার্ডিয়াক এমআরআই, কার্ডিয়াক আর্টারি ক্যালসিয়াম স্ক্যান এবং কার্ডিয়াক সিটি এনজিওগ্রামসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষারও সুপারিশ করেছেন।
‘‘আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই একাকী জীবন তার স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। অবিলম্বে এর প্রতিকার না করা হলে পরবর্তীতে আরও জটিলতা তৈরি হয়ে এই ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে যেতে পারে।’’
ইমরান খানকে হাসপাতালে স্থানান্তরের আহ্বান জানিয়ে আলভি বলেন, একটি স্বাধীন চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে ইমরান খানকে এখনই হাসপাতালে স্থানান্তর করা জরুরি। সরকারি চিকিৎসকদের ওপর তার পরিবার কিংবা পাকিস্তানের জনগণের একক আস্থা নেই।
আলভি বলেন, আগামী তিন মাস নির্ধারণ করবে তার এই স্বাস্থ্যগত অবনতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নাকি তা স্থায়ী রূপ নেবে। আমরা সবাই শঙ্কিত। দেশের স্বার্থে তাকে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখনো কারাবন্দী রয়েছেন। এদিকে বাবার সাথে পরিবার, আইনজীবী এবং চিকিৎসকদের সাক্ষাতের সুযোগ না পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইমরান খানের দুই ছেলে সুলেমান খান ও কাসিম খান।
চলতি মাসের শুরুর দিকে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারা বলেছিলেন, গত সাত মাস ধরে পরিবার, চিকিৎসক কিংবা আইনজীবীদের কাউকেই তার সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ফলে আমাদের কাছে তার বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য নেই।
ইমরান খানের রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সমর্থকেরা দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানজুড়ে আন্দোলন করছেন। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ইমরান খান ২০২২ সালে সংসদীয় অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন। পরবর্তীতে দুর্নীতি ও সরকারি গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগে একাধিক মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০২৩ সাল থেকে তিনি কারাগারে আছেন।
ইমরান খান ও তার রাজনৈতিক সহযোগীরা শুরু থেকেই বলে আসছেন, তার রাজনীতিতে ফেরা আটকাতেই এসব মামলা করা হয়েছে এবং এগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইমরান খান দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি বড় সমাবেশের নেতৃত্ব দেন। সে সময় তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও ওয়াশিংটনের সাথে চক্রান্ত করে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে। এর পরপরই পাকিস্তানের প্রশাসন পিটিআইয়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায় এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলটিকে অংশগ্রহণে বাধা দেয়।
ইমরান খানের সমর্থকরা দাবি করেছেন, রাজনৈতিকভাবে তাকে নিষ্ক্রিয় রাখতে এবং রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়া ঠেকাতেই এসব মামলা সাজানো হয়েছে।
সূত্র: এএনআই।
এসএস
