প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পদক্ষেপে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টকে ‘‘অত্যন্ত রূঢ়’’ এবং ‘‘অহংকারী’’ বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
দেশটির বার্তা সংস্থা এশিয়ান নিউজ সার্ভিসের (এএনআই) সঙ্গে আলাপকালে সিক্রি বলেন, এই ধরনের মন্তব্য একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। তারেক রহমানের দিল্লি সফরের তারিখ চূড়ান্ত করতে উভয় দেশের সরকার এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দেখুন, আমার মনে হয় এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অনুরোধের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে প্রেস নোট বা ফেসবুক পোস্ট দিয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত রূঢ় ও অহংকারী। এই ধরনের পরিস্থিতি একেবারেই অনভিপ্রেত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো খেলা খেলছে কি না জানি না। তবে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে; তারিখ নিয়ে কথা হচ্ছে এবং প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি আসবেন না; এমন কোনো বার্তা আমরা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাইনি।
বীণা সিক্রি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের মন্তব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিকতার অভাবেরই প্রতিফলন। তারেক রহমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে দুটি আমন্ত্রণ জানানো হলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়ে প্রেস বিবৃতি দেওয়া মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের গুরুত্বের প্রতি এক ধরনের গুরুত্বহীনতা প্রকাশ করে। প্রথমত, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শপথ নেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী মোদি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে তাকে প্রথম আমন্ত্রণ জানান; যেখানে তাকে পরিবারসহ সুবিধাজনক সময়ে দ্বিপাক্ষিক সফরে আসার আহ্বান জানানো হয়। কথা ছিল ভারতই হবে তার প্রথম সফরস্থল, কিন্তু ছয় মাস পার হয়ে গেলেও কোনো সাড়া মেলেনি। দ্বিতীয়ত, কয়েক সপ্তাহ আগে বিমসটেক প্রধান হিসেবে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের পক্ষ থেকে তাকে দ্বিতীয় আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেটিতেও কোনো জবাব আসেনি।
ভারতের সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, প্রত্যর্পণ একটি দীর্ঘমেয়াদী আইনি প্রক্রিয়া এবং এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে যুক্ত করা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ও কূটনীতিবহির্ভূত।
তিনি বলেন, প্রথমত, এটা সবাই জানে, এবং বাংলাদেশ সরকার অন্য সবার চেয়ে ভালো জানে, যে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া একটি আইনি প্রক্রিয়া। এবং এতে বছরের পর বছর সময় লাগে। এটা বছরের পর বছর চলতে পারে। আমরা দেখেছি, যেখানে আমরা লন্ডন এবং অন্যান্য জায়গায় প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছি। এতে বছরের পর বছর লেগে যায়, এবং তা এখনও সম্পন্ন হয় না। আর যখন এটি সম্পন্ন হয়, তখনও একটি চূড়ান্ত স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকে। তাহলে কি তারেক রহমান বলছেন, তিনি আগামী দুই থেকে তিন বছর ভারতে আসতে চান না? এটাই প্রশ্ন।
‘‘এখন হঠাৎ করে যখন দ্বিপাক্ষিক সফরের প্রস্তুতি চলছে এবং সফরটি অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য খুব অল্প সময় আছে, সম্ভবত এই সপ্তাহের শেষের দিকে, আমরা দেখছি যে এখনও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সম্ভবত চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে—তখনো কোনো সাড়া না দিয়ে এই ধরনের খেলা সামনে আনা হচ্ছে। হাস্যকর শব্দটি ব্যবহার না করলেও বলব, তারেক রহমানের সফরকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে শর্তযুক্ত করা অপ্রয়োজনীয়, অ-কূটনৈতিক এবং একটি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যের সঙ্গেও মেলে না।’’
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেওয়ার পর সিক্রি এসব মন্তব্য করেছেন।
গত রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে উভয় দেশের কর্মকর্তারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ রাখছেন। আলোচনা চলমান থাকলেও গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে এক প্রেস ইভেন্টে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৈরি কূটনৈতিক উত্তেজনার দরুন কোনো চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ হয়নি বলে ঢাকা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) দণ্ডিত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের হস্তান্তরের অনুরোধে ভারতকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
তবে ভারত সরকার শেখ হাসিনার ওই কর্মসূচির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে পরিষ্কার করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের আয়োজন ছিল এবং সেখানে বলা কোনো বক্তব্যের দায় ভারত সরকার নেবে না।
সূত্র: এএনআই।
এসএস
