বিজ্ঞাপন

মার্কিন অবরোধের চাপ : জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি ইরানের

মার্কিন অবরোধের চাপ : জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি ইরানের

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ ও বন্দরগুলোতে মার্কিন বাহিনীর অবরোধের জেরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের চাপ কমাতে দেশটির সরকার এরই মধ্যে জনগণকে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

৯ কোটি মানুষ অধ্যুষিত ইরানে ক্ষমতাসীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার সাধারণ নাগরিকদের জন্য জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দেয়। ২৩ আগস্ট, রোববার এক প্রতিবেদনে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, বছরের পর বছর ধরে এই ভর্তুকি অব্যাহত রাখায় এমনিতেই দেশটির অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, সামুদ্রিক অবরোধ এবং যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতিকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, একটি পরিশোধনাগারে প্রতি লিটার পেট্রোল উৎপাদনে সরকারের খরচ হয় প্রায় ১৩ লাখ রিয়াল। অথচ সর্বনিম্ন স্তরে জনগণের জন্য পেট্রোলের দাম নির্ধারিত রয়েছে মাত্র ১৫ হাজার রিয়াল। এছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের পেট্রোলের দাম যথাক্রমে ৩০ হাজার ও ৫০ হাজার রিয়াল। তবে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় এসব দাম অত্যন্ত কম হওয়ায় জ্বালানি খাতে সরকারের আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

বর্তমানে ইরানে সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ লিটার জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ লিটার। ঘাটতি মেটানোর জন্য গত কয়েক বছর ধরে জ্বালানি তেল আমদানি শুরু করেছিল ইরান, কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

 ফলে প্রতিদিনই বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ঘাটতি সামাল দিতে রিফাইনারিগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে জ্বালানি পাতলা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইরানে জ্বালানির দাম বাড়ানো অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়। ২০১৯ সালে পেট্রোলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারির আন্দোলনের কয়েক সপ্তাহ আগেও জ্বালানির দাম পরিবর্তন করা হয়েছিল। এই কারণে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এক ভাষণে বলেন, দেশের মানুষ যেন কষ্ট না পায়, সরকার সে চেষ্টা করছে। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, শত্রুরা ইরানকে ব্যর্থ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর দেশটির অর্থনীতিতে চাপ আরও বেড়েছে। খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের দরও রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমে গেছে। তবে ইরানের জ্বালানি অপটিমাইজেশন বিভাগের প্রধান ইসমাইল সাঘাব-ইস্পাহানি জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় তিনটি সম্ভাব্য বিকল্পের কথা জানিয়েছেন।

প্রথমত, বর্তমান দাম অপরিবর্তিত রেখে পাম্পে মজুত জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সেগুলো বন্ধ রাখা। দ্বিতীয়ত, গাড়ি থাকুক বা না থাকুক, দেশের প্রতিটি নাগরিককে মাসে ৩০ লিটার পেট্রোল দেওয়া এবং প্রয়োজনে তা বিক্রির সুযোগ রাখা। তৃতীয়ত, পেট্রোলের দাম পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। তৃতীয় পদ্ধতিতে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম প্রায় ৮ লাখ ৭২ হাজার রিয়াল হতে পারে। তবে এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেরমান প্রদেশে এই সর্বোচ্চ দাম কার্যকরের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করে সরকার। তবে প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-রেজা আরেফ জানিয়েছেন, সর্বনিম্ন ৬০ লিটারের কোটা বহাল রেখে ধীরে ধীরে পরবর্তী স্তরগুলোর দাম পরিবর্তন বা উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

সব মিলিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি ঘাটতি ও বিপুল ভর্তুকির বোঝার মধ্যে ইরান সরকার জ্বালানির দাম পুনর্নির্ধারণের দিকে এগোচ্ছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান মূল্যস্ফীতির কারণে এ সিদ্ধান্ত দেশটির অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র : আলজাজিরা

এসএমডব্লিউ