যুক্তরাজ্যে হোটেলে থাকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২০২৬ সালে কমে অর্ধেক হয়েছে। চলতি বছরের জুনের শেষে যুক্তরাজ্যের ১৬০টি হোটেলে ১৬ হাজার ২১ জন আশ্রয়প্রার্থী ছিলেন। এক বছর আগে একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৪১ জন। ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক পটরিসংখ্যানে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আশ্রয় ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে বৈধ পথে যুক্তরাজ্যে আসা এবং আশ্রয়ের আবেদন করার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে বেসরকারি আবাসনে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। সরকার হোটেল থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের একাধিক পরিবারের বসবাসের উপযোগী ব্যক্তিগত ভাড়া বাড়িতে বা এইচএমওতে স্থানান্তর করছে।
চলতি বছরের জুনের শেষে ১৬০টি হোটেলে ১৬ হাজার ২১ জন আশ্রয়প্রার্থী ছিলেন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৪১ জন। আর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৫৬ হাজার ১৮ জনে পৌঁছেছিল।
আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হোটেলগুলো বিশেষ করে গত গ্রীষ্মে উগ্র-ডানপন্থীদের বিক্ষোভ ও উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সরকার চলতি সংসদীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এসব হোটেলের ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে দেশটির সরকার বলেছিল, সম্প্রতি আরও ১৩টি হোটেলের ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে।
তবে এখনো হাজার হাজার মানুষ অন্য ধরনের অস্থায়ী আবাসনে রয়েছেন। এসব আবাসন নিয়েও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এই জনগোষ্ঠীর জন্য এসব আবাসনের জীবনযাত্রার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬৯ হাজার ৩৮ জন আশ্রয়প্রার্থী অস্থায়ী আবাসনে রয়েছেন। হোটেল থেকে অন্য ধরনের আবাসনে আশ্রয়প্রার্থীদের স্থানান্তরের কারণে আশ্রয় ব্যবস্থায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ৮ শতাংশ কমেছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন আরও সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যক্তিগত ভাড়া বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার জন্য বেশি অর্থ দেওয়ার কথা সরকার বিবেচনা করছে। এই পরিকল্পনাটি ইংল্যান্ডের গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের পরিকল্পনার অংশ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, এসব পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে সরকার ‘সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনছে এবং অভিবাসন ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করছে।’
তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে আশ্রয়ের আবেদন জমে থাকা সংখ্যা কমেছে, হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমছে, অবৈধভাবে কাজ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং নির্বাসন ও ফেরত পাঠানোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
• ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি কমেছে
ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ঘটনা এক বছরে ২৩ শতাংশ কমেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তার বাড়ানো এবং ফরাসি পুলিশের নৌকা আটকানোর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এমন পারাপার কমে এসেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ফ্রান্স সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলেন। এর আওতায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করা কিছু অভিবাসীকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর বিনিময়ে অন্য কিছু মানুষকে যুক্তরাজ্যে আসার নিরাপদ ও বৈধ পথ দেওয়ার কথা ছিল। এই নীতিকে ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ নীতি বলা হয়।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা চালুর পর ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ঘটনা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। মোট ২১০টি ঘটনায় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮১টি ঘটনায় শারীরিক নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। ফরাসি সরকারের সঙ্গে এই ব্যবস্থা চালুর পর থেকে এমন ঘটনার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।
দাতব্য সংস্থাগুলো বলছে, ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর সময় আশ্রয়প্রার্থীরা আহত হওয়ার ঘটনাও তারা নথিবদ্ধ করেছে। শাবানা মাহমুদ বলেন, ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার ঘটনা ঠেকাতে এখনো আরও কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ছোট নৌকায় আসার সংখ্যা এখন কমছে। তবে আমরা আত্মতুষ্ট নই এবং আমাদের আরও অনেক কিছু করতে হবে। এ কারণেই ফ্রান্সের সৈকত ও বিদেশে নজরদারি ও অভিযান বাড়ানো হয়েছে এবং মানুষকে অনিরাপদ ও অবৈধ পথে এখানে আসতে উৎসাহিত করা কারণগুলো মোকাবিলায় নতুন আইন করা হয়েছে।
• আশ্রয় আবেদনে জট
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির নুনি ইয়র্গেনস বলেন, আশ্রয়ের সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া সম্ভব হওয়ায় সরকার অনেক হোটেল খালি করতে পেরেছে। তবে এখন আদালতে আশ্রয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের আবেদন জমে যাচ্ছে।
এদিকে নতুন পরিসংখ্যান বলছে, অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগের জন্য স্পন্সর করার অধিকার হারানো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। ব্রেক্সিটের পর চালু হওয়া এই ব্যবস্থা শুরু হওয়ার পর থেকে এবারই এমন লাইসেন্স বাতিলের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থা ওয়ার্ক রাইটস সেন্টারের তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা একটি আবেদনের তথ্য এবং ত্রৈমাসিক অভিবাসন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে অভিবাসী কর্মীদের স্পনসর করার লাইসেন্স বাতিলের সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ৪০৩ হয়েছে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮২৮।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেল থেকে সরিয়ে অন্য আবাসনে স্থানান্তর করাই সমস্যার সমাধান নয়। একই সঙ্গে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন এবং আইনগত অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। ইনফোমাইগ্রেন্টস।
এসএস
