যেসব বিদেশি নাগরিক এইচ-১ বি বা কর্মীভিসায় বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন, তাদের জন্য দুঃসংবাদ। সম্প্রতি দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে মার্কিন পার্লামেন্টে। সেই প্রস্তাবনায় এমন আইন পাস করার সুপারিশ করা হয়েছে, যেটি প্রণয়ন করা হলে চাকরি হারানো মাত্র যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে কর্মীভিসায় আসা অভিবাসীদের।
এতদিন কর্মীভিসায় আসা বিদেশিরা কোনো কারণে চাকরি হারালে নতুন চাকরি খোঁজার জন্য ৬০ দিনের ‘গ্রেস পিরিড’ বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ পেতেন, নতুন প্রস্তাবনায় সেই নিয়ম বাতিলের সুপারিশ করে বলা হয়েছে, “নিয়ম এমন হওয়া উচিত যে (কোনো বিদেশি) চাকরি হারালে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করার বৈধতাও হারাবে।”
“যেসব বিদেশি নাগরিক কর্মী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন, তাদের অ-অভিবাসী (নন-ইমিগ্র্যান্ট) মর্যাদা নির্দিষ্ট কর্মসংস্থানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পুনর্বহাল ও স্পষ্ট করার উদ্দেশে এ প্রস্তাবনা কংগ্রেসে পাঠানো হয়েছে। কারণ এই কর্মসংস্থানই তাদের এই দেশে প্রবেশের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে”, এক বিবৃতিতে বলেছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিদেশি কর্মীদের জন্য ২০১৭ সাল থেকে এই ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড চালু রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কর্মীরা নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজার পাশাপাশি ভিসার বৈধতা বজায় রাখার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন। একই সময়ে দেশ ছাড়ার আগে বাসাবাড়ি বিক্রি, সন্তানদের স্কুল পরিবর্তনসহ ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগও পান তারা।
ডিএইচএসের প্রস্তাব কার্যকর হলে চাকরি শেষ হওয়ার পর এই অতিরিক্ত সময় আর থাকবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার পর কোনো নতুন নিয়োগকর্তা আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মী আবার ওই ভিসার জন্য আবেদন করার সুযোগ পেতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে এইচ-১বি ভিসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯৯০ সালে চালু হওয়া এই ভিসার মাধ্যমে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে থাকে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে ভারত ও চীন থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশ এই ভিসার ওপর নির্ভরশীল।
ডেলয়েট, পিডব্লিউসি ও আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের মতো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিস, এইচসিএল টেক ও এলটিআইমাইন্ডট্রির মতো আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান বড় এইচ-১বি স্পনসরদের মধ্যে রয়েছে।
ডিএইচএসের মতে, নতুন নিয়মের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মী ব্যবস্থাপনায় সাময়িক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে একই ধরনের যোগ্যতা থাকা মার্কিন নাগরিকদের এসব পদে নিয়োগের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছে বিভাগটি।
ব্যবসায়িক অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেরার্ডি ইমিগ্রেশন ল-এর আইনজীবীদের মতে, প্রস্তাবটি কার্যকর হলে চাকরি হারানো বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মীদের হাতে থাকা সময় অনেক কমে যাবে। একই সঙ্গে কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের মানবসম্পদ বিভাগকেও আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে। কারণ চাকরি হারানোর পর নতুন স্পনসর খোঁজার জন্য কর্মীদের হাতে আর দীর্ঘ সময় থাকবে না।
প্রস্তাবিত পরিবর্তন শুধু এইচ-১বি ভিসায় সীমাবদ্ধ নয়। ই-১ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ভিসা, ই-২ বাণিজ্যিক কার্যক্রম-সংশ্লিষ্ট ভিসা, এল-১ ভিসা এবং বিজ্ঞান, শিক্ষা, ব্যবসা, ক্রীড়া বা শিল্পকলায় অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ও-১ ভিসার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া টিএন পেশাজীবী কর্মীদের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর ও চিলির নাগরিকদের এইচ-১বি১ এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষ কর্মীদের ই-৩ ভিসাও প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আওতায় আসতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত নিয়মটি এখনো কার্যকর হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে প্রায় দুই মাস জনমত গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ সময়ে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো প্রস্তাবটির বিষয়ে মতামত দিতে পারবে।
জনমত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত পর্যালোচনার পর প্রশাসন নিয়মটি চূড়ান্ত করবে। তাই আপাতত এইচ-১বি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ভিসাধারীদের জন্য ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড বহাল রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় নতুন এই প্রস্তাব সামনে এসেছে। এটি চূড়ান্ত হলে চাকরি হারানো বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে থেকে নতুন কর্মসংস্থান খোঁজার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে যাবে।
সূত্র : নিউইয়র্ক পোস্ট
এসএমডব্লিউ
