সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের মাঝে আটকা পড়েছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নৌপথে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি এখন রিয়াদের নেতৃত্বকে বিকল্প পথ খোঁজার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা গত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক হামলা চালিয়েছে সৌদি আরবে। এতে দেশটির তেল বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে; যা এমনিতেই সংকটে থাকা বিশ্ব অর্থনীতিতে যোগ করেছে নতুন দুশ্চিন্তা। সৌদিদের এই হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের অনির্ভরযোগ্য আচরণ।
পুরো যুদ্ধজুড়েই আমেরিকার ভূমিকা ছিল অনিশ্চিত। আর যুক্তরাষ্ট্রের আগামী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে অজনপ্রিয় ও স্থবির হয়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধকে নতুন করে আর বাড়াতে চান না বলেই মনে হচ্ছে।
• ইরানের হাতে নতুন ‘ট্রাম্প কার্ড’
সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ইতিবাচক ফল মেলেনি। ইরান, সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত একটি বৈঠক গত সপ্তাহের শেষের দিকে আকস্মিকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। কারণ দু’পক্ষের অবস্থানের দূরত্ব ছিল আকাশছোঁয়া।
লোহিত সাগরে হুথিদের এই অগ্রগতি বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা শিথিল হওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের হাতে এসেছে আরেকটি কৌশলগত টেক্কা বা ‘ট্রাম্প কার্ড’।
সৌদি আরবে নিযুক্ত মার্কিন সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি সাম্প্রতিক এসব পরিস্থিতিকে রিয়াদের জন্য ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, ইরানিদের প্রতি তীব্র বৈরিতা থাকলেও সৌদি কখনোই এই যুদ্ধ চায়নি। বরং এটি নিয়ে তাদের গভীর শঙ্কা ছিল। আর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাদের দেখা সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নগুলোই এখন সত্যি হতে শুরু করেছে।
তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সৌদি সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেনি। অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সৌদি এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেছেন, রিয়াদ নিজের সুরক্ষায় বদ্ধপরিকর এবং লোহিত সাগরে মুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সহযোগীদের নিয়ে কাজ করে যাবে।
• সংকুচিত হচ্ছে কৌশলগত অবস্থান
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত কয়েক বছর ধরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল অতি-রক্ষণশীল এই দেশটিকে আধুনিক, সমৃদ্ধ ও সুসংহত এক বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করা।
তবে ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর বিন সালমানের সেই মহাপরিকল্পনা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। সেই সংঘাতের সূত্র ধরে একপর্যায়ে ইরানের সঙ্গেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালায়, জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও রিয়াদকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে তেহরান। এতে স্থবির হয়ে পড়ে হরমুজ প্রণালি, রুদ্ধ হয় মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরব কিছুটা বিকল্প পথ বেছে নেয়। তারা আরব উপদ্বীপের ভেতর দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পৌঁছায় লোহিত সাগরে। সেখান থেকে মিসরের সুমেড পাইপলাইন ও সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি হয়ে এশিয়ায় তেল পাঠানো শুরু করে।
কিন্তু জুলাই মাস থেকে হুথিদের সঙ্গে উত্তেজনা নতুন করে চরম আকার ধারণ করে। হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ এবং দীর্ঘ চার বছর পর আবার বড় ধরনের হামলা শুরু করে।
• জটিল হচ্ছে হুথি সংকট
মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তর; তিন দিক থেকেই সৌদি আরবে হামলা জোরাল করেছে।
আগস্টের শেষভাগে হরমুজ প্রণালিতে এক সৌদি তেল ট্যাংকারে হামলায় দুই নাবিক নিহত হন। আর গত সপ্তাহে হুথিরা বলেছে, তারা সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর নগরী ও লোহিত সাগরের একটি দ্বীপ ছিনিয়ে নিয়েছে। এর মাধ্যমে বাব আল-মানদেব প্রণালিতে সৌদি রপ্তানির পথ পুরোপুরি আটকে দেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি।
এর পরপরই রিয়াদ জানায়, দেশের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো থেকে লোহিত সাগরগামী মূল পাইপলাইনের সরবরাহ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে তারা। ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার কারণে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার পর এটিই ছিল লোহিত সাগরে তেল পাঠানোর জন্য রিয়াদের একমাত্র বিকল্প ও মূল অবলম্বন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কপলারের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলার প্রত্যক্ষ প্রভাবে এশিয়ায় সৌদি তেল রপ্তানিতে মারাত্মক ধস নেমেছে। গত জুন মাসে দৈনিক যেখানে ৩৪ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হতো, আগস্টে তা একলাফে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে। অবশ্য চলতি মাসে তা কিছুটা সামলে উঠে দৈনিক ৭ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।
২০১৫ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে সৌদি আরব। তবে তাদের সমর্থিত বাহিনী ইয়েমেনে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির আগে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রাণ হারান প্রায় দেড় লাখ মানুষ আর ইয়েমেন পৌঁছে যায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দোড়গোড়ায়।
• সীমিত বিকল্পের মুখে রিয়াদ
চাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়াম বলেন, সৌদি আরব কয়েক বছর ধরে ইয়েমেন সংঘাত থেকে বেরিয়ে এসে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করছিল।
‘‘তবে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি রিয়াদকে আবার সামরিক জবাব দেওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও এখন যেসব বিকল্প তাদের সামনে খোলা আছে, তার প্রতিটির জন্যই গুনতে হবে চড়া মাশুল, আর ফলাফলও পুরোপুরি অনিশ্চিত।’’
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা সংস্থা এসিএলইডির মধ্যপ্রাচ্য প্রধান শেরওয়ান হিন্দরিন আলী বলেন, রিয়াদের সামনে এখন একটাই পথ; সামরিক অভিযান জোরদার করে হুথিদের হটিয়ে দেওয়া। কিন্তু এতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে এবং সৌদির মূল জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে হুথিদের হামলা আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, অতীতেও সৌদি আরব এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু এখন হুথিদের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। তার ওপর মার্কিন-ইরান সংঘাতের কারণে সৌদিদের কাছে রক্ষাকবচ হিসেবে প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে হুথি অথবা তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার কূটনৈতিক পথও বেছে নিতে পারে সৌদি।
তবে হুথি গোষ্ঠী বলেছে, তাদের ওপর থাকা সব ধরনের সৌদি অবরোধ প্রত্যাহার করে নিতে হবে। কিন্তু এই দাবি মেনে নেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বড় কোনো সুবিধা না পেলে ওই অঞ্চলে শান্তি আনার বিষয়ে তেহরানেরও খুব একটা আগ্রহ নেই।
• ওয়াশিংটনকে নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা
কয়েক দশক ধরে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে আসছে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো। ফলে এমন সংকটময় মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসন পাশে দাঁড়াবে; যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের এমনই আশা করার কথা ছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের ভূমিকা বরাবরই এই ভরসায় চিড় ধরিয়েছে। নিজের প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে হুথিদের হামলায় সৌদির মোট তেল উৎপাদনের অর্ধেক সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি ট্রাম্প। আবার চলতি বছরের শুরুতে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে হামলার আগেও তিনি মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করেননি। এছাড়া এরপর থেকে ইরানি হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবকে পর্যাপ্ত সুরক্ষাও দিতে পারছে না আমেরিকা।
সৌদি আরবে নিযুক্ত আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সৌদি আরবের মতো একটি দেশ আমেরিকার সঙ্গে যে সুদৃঢ় নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে, তা মূলত এই ধরনের আপৎকালীন পরিস্থিতির কথা ভেবেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে ট্রাম্পকে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান সৌদি যুবরাজ। তবে সৌদি যুবরাজের সেই আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বাইডেন প্রশাসনের সময় পেন্টাগনের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা ড্যান শাপিরো বলেন, এমনিতেই ইরানের সঙ্গে একটি অনিশ্চিত সংঘাতের মুখোমুখি মার্কিন বাহিনী, যার ওপর নৌবাহিনীর সক্ষমতা ও অস্ত্রাগারের মজুদ কমে আসছে। এমন অবস্থায় ট্রাম্প যে নতুন কোনো যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলতে চাইবেন না, এটাই স্বাভাবিক। তবে এটি সৌদির জন্য চরম হতাশাজনক এক বার্তা।
হুথি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে কতটা সামরিক সাহায্য করবে তা এখনো আলোচনার টেবিলে থাকলেও আপাতত রিয়াদকে কেবল গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে ওয়াশিংটন।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, এপি।
এসএস
