ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ১ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে গেছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। মঙ্গলবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, হুথিদের সপ্তাহব্যাপী তীব্র অভিযানের মুখে নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এক লাখের বেশি মানুষ। এই অভিযানে বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বাকি অংশ নিজেদের দখলে নেয় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে অবস্থান সুসংহত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়ার পর এই নৌপথটি বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউএনএইচসিআর সতর্ক করে বলেছে, “ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া লড়াইয়ে দেশটির ভেতরে ১ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আর প্রাণ বাঁচাতে আরও হাজার হাজার মানুষ প্রতিবেশী জিবুতিতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।”
সংস্থাটি বলেছে, বিশাল এলাকাজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় হাজার হাজার পরিবার বাড়িঘর ছাড়া হয়েছে। সংঘাত আরও বাড়লে ইয়েমেনের ভেতরে বাস্তুচ্যুতির চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের বাইরে শরণার্থী স্রোত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, কেবল গত চার দিনে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ইয়েমেন থেকে জিবুতিতে পৌঁছেছেন। প্রাণ বাঁচাতে আসা এই শরণার্থীদের ৬০ শতাংশের বেশি নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ।
জিবুতিতে নিযুক্ত ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি স্যান্ড্রিন দেশামুর বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে যখন এসব মানুষ এসে নামছে, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই চরম ক্লান্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন। সঙ্গে করে শুধু সেইটুকু জিনিসপত্রই আনতে পেরেছেন, যা হাতে বহন করা সম্ভব ছিল।
তিনি বলেন, শরণার্থীদের জরুরি সহায়তার সামর্থ্য আমাদের প্রায় শেষ পর্যায়ে। নতুন করে কোনো পরিবার আসার আগেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অতিরিক্ত সহযোগিতা প্রয়োজন।
ইয়েমেনে গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলো একেবারে খালি হাতে তড়িঘড়ি করে পালিয়ে এসেছে উল্লেখ করে ইউএনএইচসিআর বলেছে, তাদের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, মাথা গোঁজার ঠাঁই, চিকিৎসাসেবা ও মৌলিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে ইয়েমেনে অবস্থানরত সোমালিয়া ও ইথিওপিয়া থেকে আসা ৬৫ হাজারের বেশি নিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে মানবিক ত্রাণ পৌঁছানোই বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউএনএইচসিআর বলেছে, চরম নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং যাতায়াতে কড়াকড়িতে ত্রাণ তৎপরতা ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটে বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তা সরবরাহ ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে ইয়েমেনের এই উত্তেজনা বৈশ্বিক ত্রাণ ব্যবস্থার ওপর নতুন বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর সংযোগকারী বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে ক্রমাগত অস্থিতিশীলতা বজায় থাকলে তা ইয়েমেন, সুদানসহ ওই অঞ্চলের ও বাইরের অন্যান্য সংকটগ্রস্ত দেশে মানবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাবে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
সূত্র: এএফপি।
এসএস
