২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান টেলিনর মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তা ও প্ররোচনা দিয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়ের পুলিশ। দেশটির জাতীয় অপরাধ তদন্ত বিভাগ এনসিআইএস এবং নিরাপত্তা সংস্থা পিএসটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই মামলার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার অসলোতে টেলিনরের সদরদপ্তরে তদন্তকারীরা অভিযান চালিয়েছেন।
নরওয়ের পুলিশ বলেছে, ‘‘টেলিনর মিয়ানমার সামরিক জান্তার কাছে গ্রাহকদের অতীতের ট্রাফিক ডেটা হস্তান্তর করেছে। তথ্যগুলো এমন সময়ে হস্তান্তর করা হয়, যখন জান্তা সরকার বেসামরিক জনগোষ্ঠীর একাংশের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন ও নির্যাতন চালাচ্ছিল।’’
সেই অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে নিজেদের ব্যবসা বিক্রি করে দেয় টেলিনর। ২০২২ সালের মার্চ মাসে সেখান থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় সংস্থাটি। টেলিনর বলেছে, তদন্তকারীদের নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করছে তারা।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মিয়ানমার সরকারের এক মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিক তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
• মামলায় যা বলা হয়েছে
টেলিনরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সুইডেনের একটি অলাভজনক সংস্থা। চলতি বছরের শুরুর দিকে করা মামলায় বলা হয়, মিয়ানমার জান্তা সরকারের সন্দেহভাজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কল লগ এবং লোকেশন ডেটা, অর্থাৎ অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করেছিল টেলিনর। এর ফলে অন্তত একজন বিশিষ্ট কর্মীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
• নিরুপায় ছিল টেলিনর?
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য জানাতে গিয়ে টেলিনর দাবি করেছে তারা পরিস্থিতির শিকার। প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে রয়টার্সকে বলেছে, সামরিক অভ্যুত্থানটি মিয়ানমারের জনগণের জন্য ছিল এক ট্র্যাজেডি। সেই অবস্থায় আমরা এমন এক অসম্ভব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম যে আমাদের হাতে ভালো কোনো বিকল্পই ছিল না।
বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করলে কর্মীদের কারাবাস, নির্যাতন বা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল। আমাদের সামনে তখন আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না এবং আমরা আমাদের কর্মীদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারতাম না।
টেলিনর বলেছে, এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়নি বা কাউকে তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে অসলোতে অবস্থিত মিয়ানমার দূতাবাসের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছে রয়টার্স। তবে কোনো সাড়া মেলেনি।
• নিষেধাজ্ঞার আওতায় নজরদারি সরঞ্জাম
নরওয়ের পুলিশ বলেছে, মিয়ানমারে নিজেদের ব্যবসা বিক্রির প্রক্রিয়ায় নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নজরদারি সরঞ্জামও হস্তান্তর করেছে টেলিনর। সেই লেনদেনে নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না নেওয়ায় টেলিনরের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
জাস্টিস ফর মিয়ানমারের মুখপাত্র ইয়াদানার মাউং রয়টার্সকে বলেন, মিয়ানমারে নরওয়ের ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে টেলিনরের বিরুদ্ধে নরওয়ের পুলিশের তদন্ত করার সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই।
নরওয়ের তদন্তকারীদের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টসের (আইসিজে) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে জাস্টিস ফর মিয়ানমার।
ইয়াদানার মাউং বলেন, আইসিজে নরওয়ের সঙ্গে মিলে পুলিশের কাছে আমরা যে নথিপত্র জমা দিয়েছিলাম, তাতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কোম্পানির কাছে টেলিনরের স্পাইওয়্যার হস্তান্তর এবং সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।
‘‘আমরা আশা করি, টেলিনরের কর্মকাণ্ড এবং তাদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের জনগণের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে।’’ ডিডব্লিউ।
এসএস
