বিজ্ঞাপন

দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি পূরণই মূল প্রতিবন্ধকতা
বিরতির পর নারীদের কর্মজীবনে ফেরা

দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি পূরণই মূল প্রতিবন্ধকতা

অ+
অ-

পারিবারিক দায়িত্ব, মাতৃত্বকালীন ছুটি কিংবা উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে নারীদের ক্যারিয়ারে সাময়িক বা দীর্ঘ বিরতি বা 'ক্যারিয়ার ব্রেক' একটি খুব সাধারণ চিত্র। বাংলাদেশের অনেক নারী এই বিরতির কারণে কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন । কিন্তু এই বিরতির পর পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসাটা অধিকাংশ নারীর জন্যই এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ ও সংস্কৃতির বিবর্তন এবং দীর্ঘদিনের জড়তা – সব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাসের এক বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নারীদের পুনরায় কর্মক্ষম ও নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ওয়াটারএইড বাংলাদেশের উদ্যোগে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে ‘ওমেন্স রিটার্নশিপ প্রোগ্রাম’। আর এই কার্যক্রমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কর্মবিরতিতে থাকা নারীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন। এই দায়িত্বটি নিষ্ঠার সাথে পালন করেছে দেশের স্বনামধন্য নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কাজী কন্সাল্ট্যান্টস’।

বিজ্ঞাপন

কাজী এম আহমেদ-এর নেতৃত্বে এবং কাজী কনসালটেন্টসের অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রশিক্ষণ কোনও গৎবাঁধা কর্মশালা ছিল না, বরং এটি ছিল নারীদের জন্য নিজেদের নতুন করে আবিষ্কারের এক যাত্রা ।

প্রশিক্ষণ শুরু করার পূর্বেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সেক্টরের মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষ সেশনের আয়োজন করেছিল ওয়াটারএইড বাংলাদেশ, যা পরিচালনা করেছিলেন কাজী কন্সাল্ট্যান্টস-এর প্রধান কাজী এম আহমেদ। এই সেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশা এবং পেশাজীবনে বিরতিতে থাকা নারীদের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সংশয়গুলো সরাসরি শোনা। আলোচনায় উঠে এসেছিল যে, অনেক নিয়োগদাতার ধারণা ছিল বিরতি নেওয়া নারীদের কর্মদক্ষতার ঘাটতি থাকে এবং তারা আধুনিক কর্মপরিবেশের গতির সাথে মানিয়ে নিতে পারেন না। এই ভুল ধারণা ভাঙার লক্ষ্যেই কাজী কন্সাল্ট্যান্টস তাদের পুরো প্রশিক্ষণ মডিউলটি সাজিয়েছিল, যা নিয়োগকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনেও বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।

দীর্ঘদিন কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকার ফলে ‘স্কিল গ্যাপ’ বা দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে নারীদের মনে যে ভীতি তৈরি হয়েছিল,  তা দূর করাই ছিল কাজী কনসালটেন্টসের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা এমন একটি ট্রেনিং মডিউল ডিজাইন করেছিল যা ছিল 'সফ্‌ট স্কিল' (যেমনঃ যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান করার দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা ইত্যাদি) এবং 'হার্ড স্কিল' (যেমনঃ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের দক্ষতা ইত্যাদি) এর এক অনন্য সংমিশ্রণ।
 
পুরো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন অংশগ্রহণকারীরা বর্তমান চাকরি বাজারের চাহিদার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন । এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট বা নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অ্যাডভান্সড ডেটা অ্যানালাইসিস এবং ডিজিটাল লিটারেসির মতো কারিগরি বিষয়গুলো । তবে কাজী কন্সাল্ট্যান্টস অনুধাবন করেছিল যে, কেবল কারিগরি জ্ঞানই যথেষ্ট নয়। তাই এর পাশাপাশি সফল নেগোসিয়েশন করার দক্ষতা এবং ফলপ্রসূ যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল । কাজী কন্সাল্ট্যান্টস এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কাজী এম আহমেদ বিশ্বাস করতেন, একজন নারীর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা কেবল তার পদবিতে নয়, বরং তার আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। এই দর্শন থেকেই প্রশিক্ষণটিতে অংশগ্রহণকারীদের 'গ্রোথ মাইন্ডসেট' এবং সাইকোলজিক্যাল এমপাওয়ারমেন্ট বা মানসিক ক্ষমতায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল । প্রতিটি সেশন ছিল অংশগ্রহণমূলক, ফলে তারা যা শিখছিলেন তা তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়েছিলেন ।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন ইন্টারভিউ বোর্ডের মুখোমুখি না হওয়ার ফলে যে ভীতি কাজ করত, তা কাটাতে কাজী কন্সাল্ট্যান্টস আয়োজন করেছিল বিশেষ 'মক ইন্টারভিউ' সেশন । এই সেশনগুলোর জন্য বিভিন্ন খাত থেকে অভিজ্ঞ মানব-সম্পদ কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল । এটি কেবল একটি সাজানো সাক্ষাৎকার ছিল না; বরং এখানে অংশগ্রহণকারীদের সিভি বা রেজ্যুমে সাজানো থেকে শুরু করে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং কঠিন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কৌশল হাতে-কলমে শেখানো হয়েছিল । এই সেশনগুলো অংশগ্রহণকারীদের জড়তা কাটাতে খুবই ভালো কাজ করেছিল। মানব-সম্পদ বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সরাসরি মূল্যায়ন পাওয়ার ফলে তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে কোথায় তাদের উন্নতি প্রয়োজন এবং কীভাবে নিজের অভিজ্ঞতাকে আরও ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

প্রতিটি মানুষের চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা ভিন্ন। এই বিষয়টি মাথায় রেখে ‘ওমেন্স রিটার্নশিপ প্রোগ্রাম’ -এর আওতাধীন নারীদের জন্য কাজী কন্সাল্ট্যান্টস প্রশিক্ষকরা 'ওয়ান-টু-ওয়ান কোচিং' বা ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। এখানে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকরা অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের বাধাগুলো শুনেছিলেন এবং তা অতিক্রমের জন্য বিশেষায়িত সমাধান প্রদান করেছিলেন। কারো হয়ত কথা বলার জড়তা ছিল, কারও ক্যারিয়ারের ট্র্যাক পরিবর্তন নিয়ে দ্বিধা ছিল – এই কোচিং সেশনগুলোতে প্রতিটি সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান খোঁজা হয়েছিল। এই বিশেষায়িত যত্ন অংশগ্রহণকারীদের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিল যে, তারা একা নন এবং তাদের পাশে অভিজ্ঞ পরামর্শদাতারা আছেন।

কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসার লড়াইটা যতটা বাইরের, তার চেয়ে অনেক বেশি মানসিক। পারিবারিক চাপ সামলে পেশাজীবন পুনরায় ক্যারিয়ার শুরু করার মানসিক ধকল সামলাতে কাজী কন্সাল্ট্যান্টস তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ‘ওয়েলবিং এবং মেন্টাল হেলথ’ বা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ অধিবেশন অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কীভাবে 'ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স' বা কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, কীভাবে চাপ ও ধকল সামলানো যায় এবং নিজের ভালো থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল । এই অধিবেশনগুলো অংশগ্রহণকারীদের মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল করেছিল, যা তাদের পরিবর্তনের সময়টিকে সহজ করে তুলেছিল।

বিজ্ঞাপন

শুধু একটি চাকরি জোগাড় করা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনা তৈরিতেও সহায়তা করেছিল এই প্রশিক্ষণ। অংশগ্রহণকারীরা আগামী পাঁচ বা ১০ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখন কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা নির্ধারণে কাজী কন্সাল্ট্যান্টস এর বিশেষজ্ঞরা সহায়তা করেছিলেন। এটি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একটি পেশাদারী দূরদৃষ্টি তৈরি করেছিল।

এই কর্মসূচির সফলতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল এর ধারাবাহিকতা এবং অংশগ্রহণকারীদের ক্ষমতায়ন। কাজী কন্সাল্ট্যান্টস এর এই যাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল – প্রথম ব্যাচের একজন প্রতিভাবান অংশগ্রহণকারীকে পরবর্তীতে কাজী কন্সাল্ট্যান্টস তাদের টিমে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, তাকে পরবর্তী ব্যাচগুলোর সমন্বয় এবং প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এটি কেবল একটি চাকরির সুযোগ ছিল না, বরং এটি প্রমাণ করেছিল যে সঠিক প্রশিক্ষণ এবং সুযোগ পেলে নারীরা কত দ্রুত নিজেদের প্রমাণ করতে পারেন। একজন অংশগ্রহণকারী যখন নিজেই আয়োজকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তখন তা পরবর্তী ব্যাচের নারীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়াও, প্রথম ব্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই তিনজন অংশগ্রহণকারী চাকরির অফার পেয়েছিলেন ও পরবর্তী ধাপে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, যা ছিল এই উদ্যোগের তাৎক্ষণিক সাফল্যের প্রমাণ।

পরিশেষে বলা যায়, ‘ওমেন্স রিটার্নশিপ প্রোগ্রাম’ -এর মাধ্যমে কাজী কন্সাল্ট্যান্টস কেবল নারীদের প্রশিক্ষণই দেয়নি, বরং তাদের হৃত আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদান রাখার পথ সুগম করেছিল। অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন সেশনে পর্যায়ক্রমিক উন্নতি প্রদর্শন এবং কর্মক্ষেত্রে ফেরার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন । কাজী এম আহমেদ এবং তার প্রতিষ্ঠানের এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা প্রমাণ করেছে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পেলে কোনো বিরতিই নারীর সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না। 'অনির্বাণ: রাইজ অ্যান্ড লিড' স্লোগানকে ধারণ করে এই নারীরা এখন নতুন উদ্যমে পেশাজীবনের চ্যালেঞ্জ জয় করতে প্রস্তুত হয়েছেন । এই প্রোগ্রামটি ভবিষ্যৎ ব্যাচগুলোর জন্যও একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে দিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন