থানায় ‘লাশ মামুন-ভায়রা মামুন’ নামে কনস্টেবল ছিলেন কি না

আশুলিয়ায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষ হয়েছে। জেরায় আশুলিয়া থানায় লাশ মামুন ও ভায়রা মামুন নামে কোনো কনস্টেবল ছিলেন কি না তা তদন্ত কর্মকর্তার জানতে চান এক আসামির আইনজীবী।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ জেরা চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খানকে এমন প্রশ্ন করেন আইনজীবী আবুল হাসান। তিনি এ মামলার আসামি আশুলিয়া থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদারের হয়ে আইনি লড়াই করছেন।
এদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ জেরা শুরু হয়। প্যানেলের অন্য সদস্য জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
জেরার একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে আবুল হাসান বলেন, আপনি এ ঘটনার সঙ্গে (আশুলিয়া থানার সামনে ছয়জনের লাশ পোড়ানো) প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অব্যবহিত পরের পত্রিকা দাখিল করেননি। জবাবে তা সত্য নয় বলে জানান জানে আলম খান।
২০ জুলাই সরকার কারফিউ জারি করেছে; এমন কোনো কিছু তদন্তে পেয়েছেন কি না প্রশ্নে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সরকার কর্তৃক কারফিউ জারির বিষয়ে কোনো কাগজপত্র জব্দ বা দাখিল করিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি মাকসুদ কামালের কথোপকোথনের অডিওর সঙ্গে এসআই আবদুল মালেক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদারের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন আইনজীবী। তখন হ্যাঁ সম্বোধন করে এটা সত্য বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
এ সময় আবুল হাসান প্রশ্ন করেন, এ মামলায় তদন্তকালে আশুলিয়া থানায় কর্মরত কনস্টেবল আবদুল হক, কনস্টেবল লাশ মামুন, ভায়রা মামুন, এএসআই জাকারিয়া, সমন ডিউটিকারী কনস্টেবল জুয়েল নামীয় লোকদের কোনো অস্তিত্ব পেয়েছেন কি না।
জবাবে জানে আলম খান বলেন, আমি তদন্তকালে এসব নামীয় লোকদের অস্তিত্ব পাইনি। ঠিক তখনই পুলিশ কনস্টেবলদের ডিউটি চার্ট জব্দ করেছেন কি না জানতে চান আইনজীবী। তবে ডিউটি চার্ট জব্দ করেননি বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
এ পর্যায়ে প্রসিকিউশনের দাখিল করা একটি ভিডিও প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করেন আবুল হাসান। তখন ট্রাইব্যুনালে এক মিনিট ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও দেখানো হয়। ভিডিওটির ৬ সেকেন্ডে যে ব্যক্তিকে আরেকজনের সহায়তায় একটি লাশ চ্যাং-দোলা করে তিন চাকার ভ্যানে তুলতে দেখা যায়, সেই ব্যক্তির পুলিশ ভেস্টের নিচে হাফহাতা হালকা আকাশি শার্ট ও ছাই রঙের প্যান্ট দেখা যায়। তার পায়ে ছিল কালো জুতা।
ভিডিও প্রদর্শন শেষে এ ধরনের পোশাক পরিহিত ব্যক্তি পুলিশ নন বলে দাবি করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। তবে এ দাবি সত্য নয় বলে জানান জানে আলম।
প্রশ্ন ছুড়ে আবুল হাসান বলেন, আপনার দাখিল করা ভিডিও ফুটেজে কি এসআই আবদুল মালেককে দেখা গেছে। তাকে দেখা যায়নি বলে জবাব দেন মামলার সর্বশেষ এই সাক্ষী।

সঠিকভাবে তদন্ত করলে মালেক ও মুকুলের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতেন না বলে উল্লেখ করেন আইনজীবী।
এরপর সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ পলাতক তিনজনের পক্ষে জেরা করেন আইনজীবী সুজাদ মিয়া। এদিন প্রথমেই তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন আসামি শাহিদুল ইসলামের আইনজীবী আসাদুজ্জামান বাবু।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ১৬ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন আটজন। তারা হলেন- ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই আবদুল মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদার। তাদের আজ সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করেছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন বিকেলে আশুলিয়ায় গুলিতে প্রাণ হারান ছয় তরুণ। এরপর ভ্যানে তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেয় পুলিশ। নৃশংস এ ঘটনার সময় একজন জীবিত থাকলেও বাঁচতে দেওয়া হয়নি। এছাড়া এর আগের দিন একজন শহীদ হয়েছিলেন। এ ঘটনায় একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়। মামলাটি এখন চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে।
এমআরআর/এসএম