গুলি চালানোর নির্দেশ নিয়ে ‘চাঞ্চল্যকর’ জবানবন্দি

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে কুষ্টিয়া শহরও ছিল উত্তপ্ত। মিছিল বা আন্দোলনে নামলেই ছাত্র-জনতাকে পড়তে হতো গুলির মুখে। হাসপাতালও ছিল না নিরাপদ। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ আর পুলিশের সশস্ত্র নৃশংসতায় নিভে যায় ছয় প্রাণ। গুলিবিদ্ধ হন আরও অনেকে। তবে যার নির্দেশে এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল তা উঠে এসেছে এক প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দিতে।
কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ ছিল আজ (৭ জানুয়ারি)। এ মামলায় মোট আসামি চারজন। তারা হলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা।
এই চার আসামির বিরুদ্ধে পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ৩১ বছর বয়সী এক সমন্বয়ক। নিরাপত্তার স্বার্থে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ১২ জুলাই রাতে আমাদের ১২ জনের একটি বৈঠক হয়। এরপর রাতেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের ব্যানারে ছোট একটি মিছিল করি। পরবর্তী সময়ে ১৮ জুলাই ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে দিনের বেলায় একটি মিছিল হয়। মিছিলটি সাদ্দাম বাজার থেকে শুরু হয়ে চৌড়হাস মোড় পর্যন্ত যায়। পথে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এতে আন্দোলকারী কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। একপর্যায়ে তাদের ধাওয়ায় মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আমি তখন হাসপাতালে আহত ছাত্র-ছাত্রীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। কিন্তু হাসপাতালে এসে চিকিৎসা দিতে বাধা দেন ছাত্রলীগের ছেলেরা। ফলে ছদ্মনামে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন আন্দোলনকারীরা।
তিনি বলেন, কুষ্টিয়ায় কোনোভাবেই আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের রাজপথে নামতে দিতো না আওয়ামী লীগ। ১০-১২ জন একত্রিত হলেই তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালাতো তারা। ফলে কুষ্টিয়া জেলায় আর সেভাবে আন্দোলনটি গড়ে ওঠেনি। ২৭ জুলাই বঙ্গবন্ধু সুপার মার্কেটে অবস্থিত দলীয় কার্যালয়ে সমাবেশ করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সমাবেশে আজগর আলী, আতাউর রহমান আতা ও সদর উদ্দিন খানও ছিলেন। মাহবুব-উল-আলম হানিফের নির্দেশনায় সমাবেশটি করেন তারা। কুষ্টিয়া জেলায় কোনোভাবেই আন্দোলন হতে দেওয়া হবে না বলে বক্তারা উল্লেখ করেন। প্রয়োজনে যদি দু-একটি লাশ ফেলতে হয়, তাদের কোনো আপত্তি নেই; এমন হুমকিও দেওয়া হয়।
এই সাক্ষী বলেন, সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় আন্দোলন বেগবান করতে আমরা রাতের আঁধারে বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করি। একইসঙ্গে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়। এখানে ৮৬ জন সদস্য যুক্ত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩ আগস্ট কুষ্টিয়া জেলায় মিছিলের আহ্বান জানাই। ওই দিন বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের সামনে আমরা আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেই। সেখান থেকে সাদ্দাম বাজার অভিমুখে মিছিল বের করি। সাদ্দাম বাজারে পৌঁছাতেই আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন কয়েক হাজার মানুষ। চৌড়হাস মোড় পর্যন্ত গিয়ে মজমপুরে এসে মিছিলটি শেষ করি আমরা।
এরই ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট মিছিল ডাকা হয়। বিভিন্ন উপজেলা থেকে লোকজনকে কুষ্টিয়া জেলা শহরে আসতে বলা হয়। শুধু কুমারখালী উপজেলার আন্দোলনকারীরা নিজেরা আন্দোলন করেন। আমি নিজেও কুমারখালী উপজেলা পরিষদের সামনে যাই। সেখান থেকে দুপুর ২টা নাগাদ আমরা মিছিলসহ কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হই। কুষ্টিয়ায় যাওয়ার পর চৌড়হাস মোড় থেকে বড় বাজার মোড় পর্যন্ত লাখও মানুষ অবস্থান নেন। এর মধ্যে বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার দিকে মজমপুর গেট থেকে পাঁচ রাস্তার মোড় (বর্তমানে শহীদ চত্বর) পর্যন্ত এলাকায় এপিসি থেকে টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান আন্দোলনকারীরা। আমি নিজেও ছিলাম। পরে পেছনের সড়ক দিয়ে রাস্তার মোড়ের দিকে যাই। কিন্তু গড়াই নদীর দিক থেকে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী আমাদের ওপর হামলা চালায়। এতে ১০-১৫ জন গুরুতর আহত হন।
এর মধ্যেই জানতে পারি আন্দোলনকারীদের কেউ যেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে না পারে; ফোনে এমন নির্দেশ দেন হানিফ। পরে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন। সন্ধ্যার দিকে আন্দোলনকারীরা সবাই যখন যার যার অবস্থানে ফেরত যাচ্ছিলেন, তখন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পথে আক্রমণ করে। বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি হওয়া আন্দোলনকারীদের বিছানা ছাড়তে বাধ্য করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা।
জবানবন্দিতে এই যুবক বলেন, ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে আমরা জড়ো হতে শুরু করি। তখন আমাদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে গোটা শহরের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সকাল ১০টার পর একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, একটি বিজিবির গাড়িসহ থানাপাড়া বাঁধে গিয়ে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে, যেন ওদিক দিয়ে কেউ না আসতে পারেন। থানাপাড়া এলাকা ঘনবসতি হওয়ায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে স্থানীয় লোকজন।
ওই দিন দুপুর ২টার দিকে চারদিক থেকে মাহবুব-উল আলম হানিফের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালাতে থাকে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী ও পুলিশ। তাদের ছোড়া গুলিতে শহীদ হন ছয়জন। আহত হন শত শত আন্দোলনকারী। নিহতদের মধ্যে ১৪-১৫ বছরের আব্দুল্লাহও ছিলেন।
এমন পরিস্থিতিতে আমরা থানাপাড়া মসজিদের মাইকের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে শান্ত থাকার ও সেনাপ্রধানের বক্তব্য শোনার আহ্বান জানাই। এছাড়া খুনি হাসিনার পালানোর খবর পেয়ে আমরা সমন্বয়করা একত্রিত হয়ে আন্দোলন সমাপ্ত ঘোষণা করি।
সাক্ষী আরও বলেন, হানিফের নির্দেশে এসব হত্যাকাণ্ডে সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করেন এ মামলার আসামি আতাউর রহমান আতা, সদর উদ্দিন ও আজগর আলী। কুষ্টিয়া শহরে নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও শত শত মানুষকে আহত করার জন্য চার আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা করেন পলাতক আসামিদের পক্ষে সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো. আমির হোসেন। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
এমআরআর/এসএম