ওসির জিডিতে আমার নাম ছিল না, গুলি করেছিলেন এসআই তরিকুল

জবানবন্দিতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলিসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি তিনি।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এ মামলায় আসামিপক্ষে চঞ্চলই একমাত্র সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রামপুরা থানার পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাতে নিজের কর্মস্থল খাগড়াছড়ির দিঘিনালা থানা থেকে তাকে ওসির হেফাজতে নেওয়া হয়। ২৮ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
জবানবন্দিতে চঞ্চল বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রামপুরায় বিটিভি ভবনের তিন নম্বর গেটে আমার দায়িত্ব ছিল। আমার সঙ্গে ছিলেন এসআই কামরুজ্জামান ও এসআই কামরুল হাসান। ওই দিন সকাল ৬টা থেকে ৭টার দিকে থানা থেকে সিসি নিয়ে সেখানে চলে যান কামরুজ্জামান। আমি ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে পৌঁছাই। আমার নামে ওই দিন কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ইস্যু ছিল না। আমি এসআই কামরুজ্জামানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে থাকি।
তিনি বলেন, ওই দিন বিটিভি ভবনের ভেতরে পুলিশ ছাড়াও সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব সদস্যরা দায়িত্বরত ছিলেন। দুপুরের দিকে একজন লোক আমাকে বলেন— আপনাদের ফাঁড়িতে আক্রমণ হয়েছে। ফাঁড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তখন বাইরের পরিস্থিতি ভালো ছিল না। বিকেল ৩টার দিকে বিটিভি ভবন থেকে বের হয়ে মাগরিবের আজানের পর আমি রামপুরা থানায় প্রবেশ করি।
সাফাই সাক্ষ্যে এই আসামি বলেন, ঘটনার সময় আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তখন আমি বিটিভি ভবনের তিন নম্বর গেটে দায়িত্বরত ছিলাম। ১৯ জুলাই কোন পুলিশ কত রাউন্ড গুলি খরচ করেছে, এ বিষয়ে একটি জিডি করেছিলেন রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। সেখানে আমার নাম নেই। ওই দিন আমি কোনো গুলি খরচ করিনি। কিন্তু একই বছরের ১৭ আগস্ট রামপুরা থানায় একটি জিডি করেন এসআই তরিকুল ইসলাম। এতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার নাম উল্লেখ করা হয়। যদিও ওসির জিডিতে আমার নাম ছিল না। ওসি স্যারের জিডিতে এসআই তরিকুল গুলি করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাক্ষী এসআই কিবরিয়াও ওই দিন গুলি করেছিলেন বলে উল্লেখ আছে জিডিতে। আমি পুরোপুরি নির্দোষ।
এরপর তার জেরা হয়। জেরা শেষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী ২৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন প্রথমে যুক্তি উপস্থাপন করবে প্রসিকিউশন।
চঞ্চলের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, সাইমুম রেজা তালুকদারসহ অন্যরা।
এ মামলায় পাঁচ আসামির মধ্যে চঞ্চলই গ্রেপ্তার রয়েছেন। পলাতকরা হলেন- ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। তাদের হয়ে আইনি লড়াই করছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন।
গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ৭ আগস্ট ফর্মাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই প্রাণ বাঁচাতে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন ভবনে ওঠেন আমির হোসেন নামের এক তরুণ। ওই সময় পুলিশও তার পিছু পিছু যায়। একপর্যায়ে ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকলেও তার ওপর ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন এক পুলিশ সদস্য। এতে জীবন বাঁচলেও গুরুতর আহত হন তিনি। একই দিন বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম শহীদ হন।
এমআরআর/এমজে