‘রক্তে গোটা শরীর ভিজে যায়, তখনও জীবিত ছিল মেয়েটি’

এক হাতে ছেঁড়া স্যান্ডেল, অন্য হাতে ফুল। শেখ হাসিনার পতনের দিন ছাত্র-জনতার বিজয়ের মিছিল শেষে ফিরছিলেন মেহরুন নেছা তানহা। সন্ধ্যা ঘনালেও মেয়ে না ফেরায় উৎকণ্ঠায় বাইরে অপেক্ষা করছিলেন বাবা। হঠাৎ খবর এল মেয়ের শরীরে লেগেছে গুলি। বাসায় গিয়ে দেখেন রক্তে ভেসে গেছে মেঝে। তখনও তানহা জীবিত থাকায় নেওয়া হয় হাসপাতালে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হৃদয়স্পর্শী এমনই বর্ণনা উঠে এসেছে তানহার বাবা মোশারফ হোসেনের জবানবন্দিতে।
২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ-ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ছিল আজ বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি)।
এদিন ট্রাইব্যুনাল–২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে মোশারফের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
রাজধানীর মিরপুর শাহ আলী কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন তানহা। পরিবারের সঙ্গে মিরপুর-১৩ নম্বর এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ২২ বছর।
জবানবন্দিতে মোশারফ হোসেন বলেন, ‘২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আমার দুই ছেলে ও এক মেয়েই অংশ নিত। কিন্তু প্রায়ই তাদের বারণ করতাম। ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় শহীদ হন তাদের মামাতো ভাই আকরাম খান রাব্বী। এরপর থেকে ছেলে-মেয়েকে আর ধরে রাখা যায়নি। আকরামের পরিবারেরও একই ভবনে বসবাস করতো।’
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর বিজয় মিছিল নিয়ে গণভবনে যায় তানহা ও তার ভাই। সন্ধ্যা হলেও না ফেরায় তাদের ফোন করি। বাসার আশপাশে গোলাগুলির কথা বলে তাদের পেছন দিকের রাস্তা দিয়ে বাসায় আসতে বলি।
তানহার বাবা আরও বলেন, ‘ভিডিও কলে কথা বলার সময় মেয়ের এক হাতে ছেঁড়া স্যান্ডেল ও অপর হাতে একগুচ্ছ ফুল দেখতে পাই। আমি তাকে বাসায় যেতে বলি। এরপর ছেলেকে কল দিই, কিন্তু ব্যস্ত পাই। ওই সময় ছেলের সঙ্গে কথা বলছিল তানহা। ভাইকে তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতরে চলে আসতে বলে মেয়েটি। এর ঠিক এক মিনিট পর তানহার শরীরে গুলি লেগেছে বলে ফোন দেন আমার স্ত্রী।’
তিনি বলেন, তখন আকরামের বাবা ফারুকসহ তিনি দৌড়ে বাসায় যান। গিয়ে দেখেন বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে তানহা। তার রক্তে বাসার ফ্লোর ভেসে যাচ্ছিল। তখনও জীবিত ছিল মেয়েটি। তাকে কোলে করে নিচে নামানো হয়। তার রক্তে মোশারফ হোসেনের গোটা শরীর ভিজে যায়।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ওই সময় ছেলে আব্দুর রহমান তারিফও বাসায় ফিরে আসে। সে ফোনে বোনের চিৎকার শুনতে পায়। এরপর তানহাকে মিরপুর আলোক হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চার-পাঁচ মিনিট পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। লাশ গুম হয়ে যাওয়ার ভয়ে সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাম্বুলেন্সে করে বাসায় নিয়ে আসা হয়। এরপর গোসলের পর পূর্ব বাইশটেকি কবরস্থানে নিজ হাতে মেয়েকে দাফন করেন তিনি।
মোশারফ হোসেন আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে তানহা যখন গুলিবিদ্ধ হয়, তখন আমার বাসায় সাবলেট থাকা একজন মহিলাও গুলিবিদ্ধ হন। আমি তানহা ও আকরাম হত্যার জন্য শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের, সাদ্দাম, ইনান, আরাফাত, নাছিম ও স্থানীয় এমপি নিখিলকে দায়ী করি। তাদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
এমআরআর/বিআরইউ