‘আমি শহীদ হলে ছেলে-মেয়েদের দেখে রেখো’

আমি অবশ্যই যাবো। যদি আমি শহীদ হই আমার ছেলে-মেয়েদের তুমি দেখে রেখো। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যেতে বাধা দিলে স্ত্রীকে এসব কথা বলে গিয়েছিলেন আশরাফুল ইসলাম। আর তার কথাই সত্যি হলো। ফিরলেন নিথর দেহে। আওয়ামী লীগ নেতাদের গুলিতে নিহত স্বামী হত্যার বিচার চাইলেন স্ত্রী।
রোববার (১ মার্চ) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে তিনি এ বিচার চান। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল আজ। এ মামলায় ৯ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন লাবনী আক্তার ইতি।
কুষ্টিয়া বেঙ্গল কোম্পানিতে চাকরি করতেন শহীদ আশরাফুল। তার ১২ বছর বয়সী এক ছেলে ও পাঁচ বছরের মেয়ে রয়েছে।
জবানবন্দিতে ইতি বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় কাজ থেকে ফিরছিলেন আমার স্বামী। ফেরার পথে দেখেন মজমপুর বাসস্ট্যান্ডে একটি ছোট ছেলেকে গুলি করেছে পুলিশ। দৃশ্যটি দেখে বাসায় এসে একটি লাঠি নিয়ে বের হয়ে যান তিনি। ওই সময় আমি তাকে আটকানোর চেষ্টা করি।
কিন্তু তিনি বলেন, আমি অবশ্যই যাবো। যদি আমি শহীদ হই, তাহলে আমার ছেলে-মেয়েদের তুমি দেখে রেখো।
আশরাফুলের স্ত্রী বলেন, ওই দিন রাত ১১টায় বাড়ি ফেরেন আমার স্বামী। কোথায় গিয়েছিলেন জিজ্ঞেস করলে আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানান তিনি। পরদিন ৫ আগস্ট সকাল ১০টায় বের হওয়ার সময় আমার স্বামী বলেন- যদি আমি শহীদ হই, তবে তুমি আমার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এই বাড়িতেই থাকবা। তখন তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেও কথা শোনেননি।
সাক্ষী বলেন, বাজারে আমার স্বামীর সঙ্গে ছেলের দেখা হয়। ছেলেকে তিনি বলেন- 'যদি তিনি শহীদ হন, তবে আমার ছেলে যেন তাকে জানাজা দেয়। কখন ফিরবে জিজ্ঞাসা করলে ছেলেকে আমার স্বামী জানান, তিনি বেঁচে থাকলে ১২টার মধ্যে বাড়ি ফিরবেন। ১২টার পর ছেলে আমাকে বলে ১২টা বেজে গেছে তুমি বাবাকে ফোন দাও। আমি তখন ফোন খোঁজার সময় বুঝতে পারি আমার স্বামী আমার ফোন সঙ্গে নিয়ে গেছেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাড়ির পাশের একজনের মোবাইল দিয়ে আমার স্বামীকে ফোন দেই।
ফোনে আমার স্বামী জানান, তিনি কুষ্টিয়া মডেল থানার সামনে আছেন। সেখানে খুব গোলাগুলি হচ্ছে। বাড়ি ফেরার মতো পরিবেশ নেই। তখন আমি আমার স্বামীকে পেছন দিক দিয়ে নদী পার হয়ে চলে আসতে বলি। আমার স্বামী জানা, তার আর বাড়ি ফেরা হবে না। পরে আমি আবার আমার স্বামীকে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু তার মোবাইলে সংযোগ পাইনি। আমি হরিপুর বাজারে গিয়ে আমার স্বামী ও তার বন্ধুদের খোঁজ করি। দুপুর দেড়টার সময় বাড়ির পাশের একটি ছেলে এসে আমাকে জানান, আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। খবরটি শুনে আমার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে শাশুড়ির বাসায় চলে যাই। তবে আমার শাশুড়ি আগেই সংবাদ শুনে কুষ্টিয়া আদ-দ্বীন হাসপাতালে চলে গেছেন।
ইতি বলেন, আমি আমার ছেলে-মেয়েসহ আনুমানিক আড়াইটার সময় কুষ্টিয়া আদ-দ্বীন হাসপাতালে যাওয়ার পথে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ পাই। আমি হাসপাতালের ভেতরে কিছুতেই ঢুকতে পারিনি। ওই সময় আমার স্বামীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেদিন প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল। রাস্তাঘাটে কোনো গাড়ি, রিকশা না থাকায় আমি কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে পারিনি। বিকেল ৩টায় হাসপাতালে মারা যান আমার স্বামী। পরে স্থানীয় কিছু লোক আমাকে বাসায় নিয়ে আসেন।
এই সাক্ষী বলেন, আমার স্বামীর লাশ নিয়ে শহরে মিছিল করা হয়। বিকেল সাড়ে চারটায় তার লাশটি বাড়িতে নিয়ে আসেন লোকজন। ওই দিন রাত ৯টায় জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়। শুধু আমার স্বামী নন, একই দিন কুষ্টিয়ায় আরও ছয়জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এজন্য আমার স্বামীর সঙ্গে সুরুজ আলী বাবু ও বাবলু ফরাজির জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। আমার স্বামীর শহীদ হওয়ার বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
ইতি বলেন, আমার স্বামীর মৃত্যুর জন্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগের নেতৃত্বে আমার স্বামীসহ অন্যদের গুলি করে সাহেব আলী দারোগা। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ইতিকে জেরা করেন পলাতক আসামিদের পক্ষে সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো. আমির হোসেন। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও ফারুক আহাম্মদ।
এমআরআর/এমএসএ