প্রথম নারী অ্যাটর্নি জেনারেল হতে চান ব্র্যাক গোল্ড মেডেলিস্ট শ্রেয়সী

গাইবান্ধার মেয়ে শ্রেয়সী কর্মকার। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে ঢাকায় চলে আসেন। বাবার অনুপ্রেরণায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হন। অনার্স পড়াকালীন মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় ‘বেস্ট মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন তিনি। কনভোকেশনে অংশ নেওয়া আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাইস চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল লাভ করেছেন শ্রেয়সী। তবে মেয়ের এই অর্জন দেখে যেতে পারেননি তার বাবা। ২০২০ সালে তিনি মারা যান। বাবার স্বপ্ন পূরণে শ্রেয়সী আইন পেশায় আসতে চান। মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চান। বাংলাদেশের প্রথম নারী অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেয়সী কথা বলেছেন ঢাকা পোস্টের সঙ্গে।
নিজের পারিবারিক পরিচয় সম্পর্কে শ্রেয়সী বলেন, আমার বাবার নাম তাপস কর্মকার। মায়ের নাম নন্দা কর্মকার। আমার বেড়ে ওঠা গাইবান্ধা জেলা শহরে। ছোটবেলাটা সেখানেই কেটেছে। আমার স্কুল-কলেজ ছিল গাইবান্ধার আহমদ উদ্দিন শাহ শিশুনিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখান থেকেই আমি এসএসসি ও এইচএসসি—দুটোতেই জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করি। এরপর ২০২১ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবিতে ভর্তি হই। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে আমি গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করি। আমার মা একজন গৃহিণী। আমার বোন এআইইউবি থেকে হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে। বাবার যে ব্যবসা ছিল, এখন সেটি আমার বোন দেখাশোনা করছে।
আইনে পড়ার কারণ সম্পর্কে শ্রেয়সী কর্মকার বলেন, আইন এমন একটি বিষয়, যেটা মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে মনে হয়—এটা পড়া উচিত ছিল। আমার বাবার মূলত ইচ্ছা ছিল আমি যেন ডাক্তারি অথবা আইন বিষয়ে পড়ি। কারণ তিনি বলতেন, মানুষ দুই জায়গায় খুব দুর্বল—একজন ডাক্তার এবং আরেকজন উকিলের কাছে। এখানে মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না, আর মিথ্যা বললেও শেষ পর্যন্ত সে নিজেই ক্ষতির মুখে পড়ে। বাবার এসব কথা আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করত। আমি মনে করতাম, তার পরামর্শই পৃথিবীর সেরা পরামর্শ। সেই থেকেই আইন পড়ার সিদ্ধান্ত নিই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, হাইকোর্টে এখনো অনেক মামলা পেন্ডিং রয়েছে। নিম্ন আদালতে প্রায় ৪৫ লাখের মতো মামলা ঝুলে আছে। আমাদের দেশে আরও ভালো আইনজীবীর প্রয়োজন। আমি যখন জজ কোর্টগুলোতে যাই, তখন অনেক সময় মনে হয়—এখানে আরও দক্ষ আইনজীবী দরকার। এই ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, যারা একাডেমিকভাবে খুব ভালো ফল করে, তারা হয় বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যায়, নয়তো একাডেমিক লাইনে শিক্ষকতা পেশা বেছে নেয়—লেকচারার বা প্রফেসর হয়। কিন্তু অনেকেই আইন পেশায় আসতে চান না, শুধু ঝামেলার কারণে। তবে আমার মনে হয়, আইন নিয়ে পড়ার অন্যতম বড় কারণ হলো আদালতে এসে প্র্যাকটিস করা।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি যখন ব্র্যাকে ভর্তি হই, তখন মূলত করোনার সময় চলছিল। আমাদের বেশিরভাগ ক্লাসই অনলাইনে হতো। তখন মনে হয়েছিল হয়তো আমার ক্যাম্পাস জীবনের অভিজ্ঞতা আর হবে না। কিন্তু পরে অফলাইন ক্লাস শুরু হলে আমি মহাখালীর পুরোনো ক্যাম্পাস এবং ব্র্যাকের নতুন ক্যাম্পাস—দুটোরই অভিজ্ঞতা পাই। তখন বুঝতে পারি যে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজে অংশ নেওয়া দরকার। এরপর আমি ইন্ট্রা মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নিই এবং সেখানে ‘বেস্ট মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ পাই। পরে ন্যাশনাল মুট কোর্ট কম্পিটিশন ও ন্যাশনাল ট্রায়াল প্র্যাকটিস প্রতিযোগিতায় অংশ নিই। সেখানে টিম লিডার হিসেবে ‘বেস্ট ডিফেন্স অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করি। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। নাচ-গান করতে পছন্দ করতাম। এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ বলতে মূলত এসবই করেছি। তবে পড়াশোনাকেই সবসময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।
গোল্ড মেডেল পাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে শ্রেয়সী বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫টি বিভাগের ১৫ জনকে গোল্ড মেডেল দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এমন নয় যে ব্যাচে প্রথম হলেই গোল্ড মেডেল দেওয়া হয়। ১৭তম কনভোকেশনে আইন বিভাগ থেকে যারা কনভোকেশনের জন্য আবেদন করেছে, তাদের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জন করেন, তাকেই এই গোল্ড মেডেল দেওয়া হয়। আবেদনকারীদের মধ্যে আমার অনেক সিনিয়রও ছিলেন।
গোল্ড মেডেল পাওয়ার অনুভূতি নিয়ে তিনি বলেন, অনুভূতিটা আসলে মুখে প্রকাশ করা কঠিন। স্বপ্ন পূরণের একটি বাস্তব রূপ আমি দেখতে পেয়েছি। আমার সবসময় ইচ্ছা ছিল আইন নিয়ে পড়ার, আর সেটা আমি করতে পেরেছি। সবসময় মনে হতো, যেহেতু আমি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি, তাই চাইতাম দিন শেষে আমার বাবা-মা যেন বলতে পারেন—আমার মেয়েটা কিছু করেছে। আজ আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমার একাডেমিক অর্জনে বাবা-মা ও বোনের অনেক অবদান আছে। কিন্তু গোল্ড মেডেলটা আমার নিজের অর্জন।
বর্তমান ব্যস্ততা সম্পর্কে শ্রেয়সী বলেন, বর্তমানে আমি বাংলাদেশ অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে লিগ্যাল ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করছি। এখানে মোট ২৫ জন ইন্টার্ন রয়েছে। চারটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৫ জনকে নির্বাচন করা হয়েছে। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং পরে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস থেকে—দুটি সিলেকশন রাউন্ডে উত্তীর্ণ হয়ে আমি এখানে সুযোগ পেয়েছি। এখানে কাজের অভিজ্ঞতাও বেশ সমৃদ্ধ। আমরা সাধারণত অ্যাডিশনাল, অ্যাসিস্ট্যান্ট অথবা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে কাজ করি এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করি।
এই ইন্টার্নশিপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার আনীক আর হকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন মানুষ। আমার উপলব্ধি হলো, আইন তো অনেকেই জানেন; কিন্তু তিনি যেভাবে আইনকে উপলব্ধি করেন এবং বিশ্লেষণ করেন, তা সত্যিই আলাদা, নির্ভীক ও স্বতন্ত্র। একজন আইনজীবী হিসেবে আমিও ভবিষ্যতে এই গুণগুলো নিজের মধ্যে গড়ে তুলতে চাই।
এ ছাড়া তিনি বলেন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তাসনুভা শেলীর উদ্যোগেই এই ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামটি বাস্তবায়িত হয়েছে। ইউএনডিপির সহযোগিতায় প্রথমবারের মতো অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে এই ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য আমি তার প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বপ্ন নিয়ে শ্রেয়সী কর্মকার বলেন, আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দুই দিকেই এগোনো—আমি একাডেমিক লাইনে থাকতে চাই এবং একই সঙ্গে ওকালতিও করতে চাই। যেহেতু আমার ভালো সিজিপিএ রয়েছে, তাই চেষ্টা করব এলএলএম বিদেশ থেকে করার। এরপর বার-অ্যাট-ল’ করার ইচ্ছা আছে। বাংলাদেশের আদালতে অবদান রাখারও ইচ্ছা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সবারই একটি লালিত স্বপ্ন থাকে। সবকিছু তো পরিকল্পনা অনুযায়ী হয় না। আপাতত আমি সময়ের সঙ্গে এগোচ্ছি। তবে আমার স্বপ্ন অবশ্যই দেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদ—চিফ জাস্টিস হওয়া। তার আগেও একটি স্বপ্ন আছে। যেহেতু আমি এখন অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে কাজ করছি, তাই বলতে চাই—বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো নারী অ্যাটর্নি জেনারেল হয়নি। আমি চেষ্টা করব প্রথম নারী অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার। এটা আমার একটি স্বপ্ন। জানি না কতটা করতে পারব, তবে সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।
এমএইচডি/এসএম