চোখের সামনে তিনজনকে মরতে দেখি, ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই

চোখের সামনে একে একে প্রাণ হারান তিনজন। আহত হয়ে কাতরাতে থাকেন অনেকে। গুলির শব্দ আর আতঙ্কে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে ওঠে চারপাশ। মৃত্যুময় পরিস্থিতির মাঝেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আবু জুহামুল ইসলাম। বিভীষিকাময় সেই বর্ণনা তুলে ধরেছেন ট্রাইব্যুনালের সামনে। দেখিয়েছেন নিজের শরীরের ক্ষতচিহ্নও।
বিজ্ঞাপন
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ছিল আজ (১২ মার্চ)। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন জুহামুল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দিতে জুহামুল বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বর এলাকায় আমি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেই। আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারীদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপসহ গুলি চালায় পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ। দিনভর পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। পরদিন জুমার নামাজের পর একই স্থানে জমায়েত হন ছাত্র-জনতা। ওই দিন মিরপুরবাসীর জন্য এক দুর্বিসহ দিন ছিল। কেননা আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর গুলি করে বিজিবি ও পুলিশ। আর হেলিকপ্টার গুলি ও টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে র্যাব। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগও ছিল। ওই দিন আমি আমার চোখের সামনে তিনজনকে নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে। তবে ভাগ্যক্রমে গুলির হাত থেকে আমি রক্ষা পাই।
বিজ্ঞাপন
সাক্ষী বলেন, ২০ জুলাই দিনভর কারফিউ ছিল। দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হলে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র্যাবের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। আর মিরপুরের অলিগলিতে অবস্থান নেন আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা।আমিও তাদের সঙ্গে ছিলাম। দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে একটি প্রচণ্ড শব্দ হয়। তখন একটি গুলি আমার শরীরের বুকের ওপরের অংশে বাম দিকে বিদ্ধ হয়ে হাড় ভেঙে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। এ সময় নিজের শরীরের ক্ষতচিহ্ন ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেন সাক্ষী।

তিনি বলেন, গুলিবিদ্ধ হয়ে আমি কিছুটা দৌড় দিয়ে পড়ে যাই। আমার শরীর থেকে রক্ত বের হতে দেখে কাজিপাড়ায় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান দুজন রিকশাওয়ালা। চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রক্ত বন্ধ করতে না পেরে ঢাকা মেডিকেল বা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যেতে বলেন। পরবর্তীতে একজন বিআরটিসি বাসের চালক ও আরেকজন স্কুলছাত্র আমাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যাওয়ার পর আমি এক বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখি। সেখানে অনেক আহত ও নিহতদের দেখতে পাই। এরপর আমাকে এক্সরে রুমে নিয়ে ২০ মিনিটের মতো চিকিৎসাবিহীন রেখে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিলে অবস্থা গুরুত্বর দেখে মহাখালী বক্ষ্যব্যাধি হাসপাতালে যেতে বলেন। পরে আমাকে ওই হাসপাতালে নিলে সন্ধ্যায় আমার অপারেশন হয়। অপারেশনের পর আমাকে আরসিইউতে রাখেন চিকিৎসকরা।
বিজ্ঞাপন
আহত এই সাক্ষী আরও বলেন, ২১ জুলাই আমার জীবনের আরেকটি স্মরণীয় দিন। ওই দিন সকাল ৯টার দিকে পুলিশ, ছাত্রলীগের সদস্যরা অস্ত্র ও বাঁশের লাঠিসহ হাসপাতালের আরসিইউতে ঢুকে আমাদের গালাগালি করতে থাকেন। তারা আমাদের ছবি তোলার পাশাপাশি মিথ্যা মামলা দেন। ৭ আগস্ট পর্যন্ত আমি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। এ ঘটনার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ অন্যান্যদের দায়ী করছি। আমি তাদের বিচার চাই।
এমআরআর/এমএসএ