সাদা-কালো চেক শার্ট, ছেঁড়া প্যান্ট আর শরীরজুড়ে গুলির চিহ্ন। মর্গের ঠান্ডা মেঝেতে এভাবেই পড়েছিল ইমাম হাসান তাইমের নিথর দেহ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিচয়হীন পড়ে থাকলেও পরে শনাক্ত করেন স্বজনরা। ছেলের লাশ খুঁজে পেতেই নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা বাবা। নিজের বাহিনীর গুলিতেই প্রাণ গেল তার ছেলের।
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসআই (নিরস্ত্র) মো. দেলোয়ার হোসেনের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এমন বর্ণনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ছিল সোমবার (৩০ মার্চ)। এদিন তৃতীয় নম্বর সাক্ষী হিসেবে দেলোয়ার হোসেনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন ট্রাইব্যুনাল-২।
৩৮ বছর বয়সী দেলোয়ার বর্তমানে ডিএসবিতে কর্মরত রয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন তার দায়িত্ব ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। পুলিশ সদস্যদের বা তাদের পরিবারের কেউ আহত-নিহত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই ছিল তার কাজ।
এসআই দেলোয়ার বলেন, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই আমার ব্যক্তিগত ফোনে কল করেন ডিএমপির এডিসি (ওয়েলফেয়ার)। ফোনে কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে কর্মরত এসআই (সশস্ত্র) মো. ময়নাল হোসেনের ছেলে তাইম গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢামেক হাসপাতালে আছে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আমি এসআই ময়নালের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পাই। সঙ্গে তার শ্যালিকা শাহিদা আক্তার ছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে তাইম মারা গেছেন বলে সাংবাদিকদের কাছে তিনি জানতে পেরেছেন বলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমাকে জানান। তবে লাশ খুঁজে পাচ্ছেন না।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল মর্গ ও জরুরি বিভাগের পাশের মর্গে লাশ খুঁজতে থাকি। না পেয়ে নতুন ভবনের পাশে থাকা আরেকটি মর্গের মেঝেতে লাশ দেখতে পাই। ওই সময় ছেলের লাশ শনাক্ত করেন ময়নাল। তার পাশে আরও ছয়-সাতটি লাশ ছিল।
জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, তাইমের পরনে থাকা শার্টের সব বোতাম খোলা ছিল। শার্টের রং ছিল সাদা-কালো চেক। প্যান্টের বাঁ পায়ের ওপর থেকে হাঁটুর অংশ কাটা ছিল। আমি খোলা চোখে তার তলপেটে, বুকে, দুই পায়ের হাঁটুর নিচে ও ওপরে রক্তাক্ত দেখি। যা শর্টগানের পিলেটের জখম মনে হয়েছে।
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তাইমের লাশ শনাক্তের পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আমাদের শাহবাগ থানায় পাঠান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শাহবাগ থানায় একটি জিডি করার পর এসআই মো. শাহাদাত আলীকে সুরতহাল প্রস্তুতের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কার্যক্রম শেষ হতে রাত ৯টা বেজে যায়। তখন শাহাদাত আলী জানান- ওই দিন আর কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। আমাদের পরদিন যেতে বলেন। আমরা তাইমের লাশটি মূল ভবনের মর্চ্যুয়ারিতে রেখে আসি।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ২১ জুলাই সকাল ১০ থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে ঢামেক হাসপাতাল মর্গে যাই। মর্গে পরিদর্শক নিজাম উদ্দিন, এসআই ময়নাল হোসেন ও তাইমের খালা শাহিদা ছিলেন। তখনও সুরতহাল হয়নি বলে জানান নিহতের বাবা। প্রস্তুত করতে আমাকে অনুরোধ করেন তিনি। পরে এসআই শাহাদাতের সঙ্গে যোগাযোগ করলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে মর্গে আসবেন বলে জানান। এরপর তিনি সুরতহাল প্রস্তুত করেন। সুরতহালে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করি আমি।
এসআই দেলোয়ার আরও বলেন, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর লাশটি রাজারবাগ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নেওয়া হয়। এএসআই (সশস্ত্র) মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে গোসলের সময় তাইমের কোমরের বাঁ পাশের নিচে একটি বড় ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাই। যা আমাদের কাছে পিস্তলের গুলির আঘাতের চিহ্ন মনে হয়েছে। জানাজা শেষে তাইমের নিথর দেহটি সরকারি গাড়িযোগে কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এমআরআর/জেডএস
