শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তাদের। কিন্তু সবকিছু মাটি করে দিল ঘাতকের একটি বুলেট। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মাঝপথে বেড়াতে এসে যোগ দিয়েছিলেন চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে। সেখান থেকেই লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল তাকে। ছেলের নিথর দেহ নিয়ে গ্রামে ফেরার পথেও ছিল বাধা, ভয় আর চাপ।
বিজ্ঞাপন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ছেলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার অশ্রুসজল হয়ে পড়েন আবদুল মতিন। তবু বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে শাহরিয়ার হত্যায় জড়িতদের ফাঁসি চেয়েছেন তিনি।
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান চলাকালীন কারফিউ দিয়ে গণহত্যায় উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে চতুর্থ দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ছিল আজ (৫ এপ্রিল)।
বিজ্ঞাপন
এ মামলায় ছয় নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন শাহরিয়ারের বাবা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জবানবন্দিতে আবদুল মতিন বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বরের গোল চত্বর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল আমার ছেলে। সেখানেই ছেলেটা গুলিবিদ্ধ হয়। সহযোদ্ধারা তাকে প্রথমে মিরপুরের আলোক হাসপাতালে নিয়ে যায়। এরপর আজমত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু গুরুতর হওয়ায় ওই দিনই শাহরিয়ারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসকরা।
ঘটনার দিন গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে ছিলেন আবদুল মতিন। মোবাইল ফোনে ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে নিজের ভাগ্নে রিয়াদকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে অনেক বাধা অতিক্রম করে রাত দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, হাসপাতালে এসে শাহরিয়ারকে আইসিইউতে দেখি। তার কপালে গুলি লেগে মগজের ভেতরে ঢুকেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। গুলি বেরও করেননি তারা। অপারেশন করতে সাহস পাননি। আমার অনুরোধে তারা সিটিস্ক্যান করেন। পরীক্ষার প্রতিবেদন এলে অপারেশন করা নিরাপদ হবে না বলে জানানো হয়। আমি অন্য জায়গায় চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানাই। এজন্য রিলিজ চাইলেও তারা দেননি।
শাহরিয়ারের বাবা বলেন, ২০ জুলাই দুপুর ২টা ৬ মিনিটে আমার ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। লাশ নিয়ে যেতে চাইলে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য তারা আমাকে থানায় যেতে বলেন। মিরপুর থানায় গেলে জিডি নেয়নি পুলিশ। ১৮ জুলাই ঢাকা শহরে সব জায়গাতেই গুলিবিদ্ধ হয়ে অনেকে মারা গেছেন বলে তারা আমাকে জানান। বলা হয়- 'আপনার ছেলে এই থানা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে তার কোনো প্রমাণ নেই।
শাহবাগ থানায় জিডি নিচ্ছে- এমন খবর পরদিন ২১ জুলাই জানতে পারেন আবদুল মতিন। পরে সেখানে জিডি করেন তিনি। এর একটি কপি নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে যান। এরপর শাহরিয়ারের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করা হয়।
মতিন বলেন, ওই দিন রাত ৮টায় ছেলের লাশ আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশটি গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হই আমি, আমার স্ত্রী, মেয়ে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য। কিন্তু গ্রামে নিয়ে দাফনে নিষেধ করেন আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের লোকেরা। মোবাইল ফোনে তারা এ কথা জানান। আমি রাজি না হওয়ায় রাতের আঁধারে দাফন করতে বলা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গ্রামে যাওয়ার পথে বিভিন্ন জায়গায় বাধার সম্মুখীন হই। ২২ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টায় শাহরিয়ারকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়।
তিনি বলেন, শাহরিয়ার আমার একমাত্র ছেলে। সে ইশ্বরগঞ্জ আইডিয়াল কলেজ থেকে ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল। ১০ জুলাই পাঁচটি পরীক্ষা দেওয়ার পর কয়েকদিন না থাকায় ভাটারা থানাধীন আমার ভাড়া বাসায় এসেছিল ছেলেটি। ১৬ জুলাই মিরপুরে তার খালার বাসায় বেড়াতে যায়। সেখান থেকে খালাতো ভাইসহ আন্দোলনে অংশ নেয় শাহরিয়ার। আমি আমার ছেলে হত্যার সঙ্গে জড়িত সবার ফাঁসি চাই।
সাক্ষী জানতে পারেন- তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ অন্যান্যদের কুপরামর্শে তার ছেলেসহ সারাদেশে প্রায় ১৪০০ আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। ১৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪ দলীয় মিটিং হয়। সেখানে কারফিউ জারির সিদ্ধান্তের আড়ালে তারা আন্দোলনকারী ছাত্রদের হত্যা ও নির্মূল করার কুপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ৫ আগস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসামি আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের কথোপকথন শুনতে পান। সেখানে তারা বলেছেন- কারফিউ জারির মাধ্যমে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাদের নির্মূল করা তথা হত্যা করা হবে।
জবানবন্দি শেষে আবদুল মতিনকে জেরা করেন সালমান ও আনিসুলের পক্ষের আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৫ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।
এমআরআর/এমএসএ
