‘রক্ত আর লাগবে না, রাকিব মারা গেছে’–ডাক্তারের এই একটি কথা মুহূর্তেই চুরমার করে দিলো সব আশা। সকালের নাশতা দিতে গিয়ে ছেলেকে না পেয়ে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আসে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর। এরপর এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ। শেষ পর্যন্ত সব থেমে যায় আইসিইউতে। কপালে চুমু দিয়ে ‘তোমার কিছু হবে না’ বলে সাহস জুগিয়েছিলেন যে ছেলেকে, তার মৃত্যুর মর্মান্তিক বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা হাসি আক্তার।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারিত ছিল।
এদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিন নম্বর সাক্ষী হিসেবে শহীদ রাকিবের মা ৩৮ বছর বয়সী হাসি আক্তারের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। তাঁর এই আবেগঘন সাক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মামলায় মোট আসামির সংখ্যা চারজন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ কারাগারে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদওয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত বিন আলমকে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান এখনো পলাতক রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে হাসি আক্তার জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের শুরু থেকেই অংশ নিত তাঁর ছেলে রাকিব। তিনি বলেন, ‘১৯ জুলাই (শুক্রবার) অফিস বন্ধ থাকায় আমরা সবাই বাসায় ঘুমিয়ে ছিলাম। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সকালের নাশতা নিয়ে ছেলের কক্ষে যায় আমার মেয়ে রুপা। রাকিবকে না দেখে তাৎক্ষণিক আমাকে জানায়। আমি বাসার আশপাশে খুঁজতে থাকি। একপর্যায়ে মেয়ের জামাই নুরে আলমকে দ্রুত হেঁটে যেতে দেখি। রাকিব গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলেও খবর দেন তিনি। আমার বোনজামাই জসিমও মোবাইলে একই কথা জানান।’
খবর পেয়ে হাসি আক্তার ও তার মেয়ের জামাই নুরে আলম রিকশা নিয়ে রামপুরার আফতাবনগর নাগরিক হাসপাতালে ছুটে যান। জানতে পারেন, আফতাবনগর গেটের সামনে রামপুরা ব্রিজের ঢালে রাকিবকে গুলি করা হয়েছে, যেখানে বন্ধুদের নিয়ে সে আন্দোলন করছিল।
রাকিবের মা বলেন, “নাগরিক হাসপাতালে গিয়ে দেখি রাকিবের পেটে গুলি লেগেছে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বলা হয়। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে নিয়ে যাই। সেখানে প্রথমে আমার ছেলেকে জরুরি বিভাগে দেখে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ছেলেকে দেখতে আইসিইউতে যেতে চাইলে আমাকে বাধা দেওয়া হয়। একপর্যায়ে বাধা উপেক্ষা করে ঢুকে রাকিবকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পাই। আমি তার কপালে ও গালে চুমু দিয়ে বলি, ‘তোমার কিছু হবে না’।”
বিজ্ঞাপন
এর মধ্যেই রাকিবের জন্য তিন ব্যাগ রক্ত আনেন হাসি আক্তারের এক ভাই। কিন্তু হাসপাতাল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়– ‘রক্ত আর লাগবে না, রাকিব মারা গেছেন।’ এ কথা বলেই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর ডায়াসে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাসি আক্তার।
তিনি আরও জানান, আইসিইউ থেকে বের করে রাকিবের লাশ মর্গে পাঠানো হয় এবং সেখানে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত হয়। ২১ জুলাই ছেলের লাশটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বুঝিয়ে দেয়। এরপর আফতাবনগরের একটি মসজিদে জানাজা শেষে ঝালকাঠিতে বাবার বাড়িতে রাকিবকে দাফন করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রাকিবকে রিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়ার ৩৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়, যা হাসি আক্তারের সংরক্ষণে ছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, মেরুন রঙের টি-শার্ট ও নীল রঙের জিন্স প্যান্ট পরা রাকিব গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে এবং সহযোদ্ধারা তাকে তুলে রিকশাযোগে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে হাসি আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কর্নেল রেদওয়ান, ওসি মশিউর, এডিসি রাশেদ, মেজর রাফাতসহ জড়িতদের দায়ী করছি। তারা শুধু আমার ছেলেকেই হত্যা করেনি, আরও বহু আন্দোলনকারীকে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন- প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশীদসহ অন্যরা। ট্রাইব্যুনাল এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৫ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন।
এমআরআর/বিআরইউ
