বিজ্ঞাপন

আবু সাঈদ হত্যা : রাত পোহালেই রায়, নির্ধারণ হবে ৩০ আসামির ভাগ্য

অ+
অ-
আবু সাঈদ হত্যা : রাত পোহালেই রায়, নির্ধারণ হবে ৩০ আসামির ভাগ্য

টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল রংপুর শহর। পুলিশের গুলিতে দিগ্বিদিক ছুটছিলেন শিক্ষার্থীরা। ঠিক তখনই দুহাত চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। মুহূর্তেই তার দিকে ছুটে আসে একের পর এক গুলি; রক্তে ভেসে যায় শরীর, নাম ওঠে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদের তালিকায়। অবশেষে রাত পোহালেই নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের দায়ে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় শুনবে গোটা জাতি।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) নির্ধারণ হবে এ মামলার ৩০ আসামির ভাগ্য।

গত ৫ মার্চ রায় ঘোষণার এই দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল।

মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ সাক্ষ্য দিয়েছেন ২৫ জন। তারকা সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও বর্তমান এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ। তবে তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এ মামলার ৩০ আসামির আলাদা আলাদা দায়। জবানবন্দিতে নিজের তদন্তে পাওয়া ৩০ আসামিরই ব্যক্তিগত দায় ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

প্রথমেই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে হাসিবুর রশীদের। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন বেরোবির তৎকালীন এই ভিসি। একই সঙ্গে অধীনস্থদের প্রশ্রয় দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও অন্য আসামিদের বেআইনি কার্যক্রম প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেননি তিনি। উল্টো আন্দোলন দমনে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় উসকানি ও সহযোগিতা করেন।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) তৎকালীন কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু বেরোবি প্রশাসন ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সহযোগিতা আর ইন্ধনে বেতারের (ওয়্যারলেস) মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তাদের আবু সাঈদকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেন। ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাসহ ছাত্র-জনতাকে গ্রেপ্তার-নির্যাতনের মাধ্যমে হয়রানির পথ বাতলে দেন। একই সঙ্গে শহীদ আবু সাঈদের অসত্য সুরতহাল প্রস্তুত ও মিথ্যা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরিতে চাপ প্রয়োগ করেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা।

আরএমপি কমিশনারের কথামতো সব বাস্তবায়ন করেন তৎকালীন উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু। অন্য আসামিদের নিয়ে শহীদ আবু সাঈদের অসত্য ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে চাপ দেন তিনি। ঊর্ধ্বতন এই দুই পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশ মেনে বেরোবি প্রশাসন ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের ইন্ধন, উপস্থিতি আর সরাসরি সহযোগিতায় নিজের অধস্তনদের দিয়ে কাজ করান সাবেক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন। অর্থাৎ আবু সাঈদকে হত্যার নির্দেশ দেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

প্রায় একই নির্দেশ মানেন সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন। আন্দোলন দমনে নিজ হাতেই গ্যাসগানে ফায়ার করেন তিনি। এ ছাড়া আবু সাঈদের অসত্য সুরতহাল প্রস্তুতে বাধ্য করেন। অন্য আসামিদের সঙ্গে তিনিও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন বদলাতে চাপ দেন চিকিৎসককে। তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়নের দায়ও অনেকটা কাছাকাছি। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে মিথ্যা মামলাসহ গ্রেপ্তারপূর্বক ছাত্র-জনতাকে নির্যাতনের মাধ্যমে হয়রানি করেন।

বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধবও আবু সাঈদকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যার উসকানি দেন। আন্দোলন চলাকালীন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্প ইনচার্জের (এসআই, নিরস্ত্র) দায়িত্বে ছিলেন তিনি। হয়রানি করেন নিরীহ ছাত্র-জনতাকেও।

এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে আবু সাঈদকে হত্যা করেন। কোনো ধরনের হুমকি না থাকা সত্ত্বেও আরএমপি কমিশনার মনিরুজ্জামান গংদের অবৈধ নির্দেশে পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় নির্বিচারে গুলি চালান এই পুলিশ সদস্য। তাদের একই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।

বেরোবি প্রশাসনের ইন্ধন, উপস্থিতি ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়াদের প্রশ্রয় দেন তৎকালীন প্রক্টর শরিফুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব পদে থেকেও বেআইনি কার্যক্রম প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেননি তিনি। বরং আন্দোলন দমনে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের উসকানি দেন। আবু সাঈদকে হত্যায়ও সহযোগিতা করেন।

একই ধরনের কাজ করেন বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান ও সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ। তারাও বেরোবি প্রশাসন ও পোমেল বড়ুয়া গংদের ইন্ধন, উপস্থিতি ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় উসকানিসহ সহযোগিতা করেন।

মামলার ১৬ নম্বর আসামি বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া। ১১ জুলাই বেরোবির ১ নম্বর গেটের ভেতরের সড়কে ছাত্রলীগের সহযোগীদের নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেন তিনি। নিজেই আবু সাঈদকে চড়থাপ্পড় মারেন। এ ছাড়া বেরোবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীমসহ অন্যদের উপস্থিতি ও সরাসরি সহযোগিতায় ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে হত্যায় সহযোগিতা করেন। মাহাফুজুর রহমান শামীমের দায়ও অনেকটা একরকম।

তাদের কথামতো তথা বেরোবি প্রশাসন, পোমেল বড়ুয়াদের হয়ে কাজ করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহসভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বিশ্ববিদ্যালয় এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু ও প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ। এর মধ্যে ১১ জুলাই পোমেল বড়ুয়ার নেতৃত্বে বেরোবির ১ নম্বর গেটের ভেতরের সড়কে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদ। একই সঙ্গে আবু সাঈদের গলা চেপে ধরেন তিনি।

সবশেষ ডা. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন। রংপুরে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি থাকাকালীন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আদর্শে অনুপ্রাণিত, আজ্ঞাবহ ও সহযোগী হয়ে আন্দোলন দমনে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের দিয়ে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার পর মিথ্যা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতে চিকিৎসককে চাপ দেন এই চিকিৎসক নেতা।

এ মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন ছয়জন। তারা হলেন– এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ। বাকি ২৪ জন আসামি এখনো পলাতক।

কাঙ্ক্ষিত একটি রায়ের প্রত্যাশা করছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম শহীদ। যার নির্মম হত্যাকাণ্ডের চিত্র গোটা বিশ্ব দেখেছিল। জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। সুতরাং আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। একই সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত রায় পাব বলেও আমরা আশাবাদী। কেননা মামলাটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।’

এমআরআর/বিআরইউ