নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে মিথ্যা ও উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে আদালত অবমাননার অভিযোগে যুবলীগ নেতা এমএইচ পাটোয়ারী বাবুকে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে, মানবিক বিবেচনায় তার স্ত্রী ইসমাত জেরিনকে ক্ষমা করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
বিজ্ঞাপন
রোববার (১২ এপ্রিল) বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
দণ্ডিত পাটোয়ারী বাবু ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি। তিনি সিভিল এভিয়েশনের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতেন।
আদেশ প্রদানের সময় ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘আসামির অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাজা না দিলে ভুল বার্তা যাবে। আমরা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি যে, আমরা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ আছি এবং আমাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। যেহেতু এই পোস্টটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই তাকে ন্যূনতম সাজা হওয়া উচিত যাতে অন্যরা সতর্ক হয়।’
বিজ্ঞাপন
শুনানি ও জবানবন্দি
রোববার বিকেল সাড়ে ৩টার পর এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। প্রথমেই বাবুর স্ত্রী ইসমাত আরার জবানবন্দি নেওয়া হয়। তিনি এ ঘটনার জন্য নিজেকে অপরাধী দাবি করে ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। পরে নেওয়া হয় আসামির জবানবন্দি।
জবানবন্দিতে আসামি পাটোয়ারী বাবু নিজের ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া বিতর্কিত পোস্টটি পড়ে শোনান। এ সময় তিনি দাবি করেন, অন্য একটি আইডি থেকে লেখাটি কপি করে তিনি নিজের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছিলেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের উসকানিমূলক পোস্ট বা বক্তব্য দেবেন না বলে অঙ্গীকার করে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
বিজ্ঞাপন
আসামির জবানবন্দি শেষে এ মামলার বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার বক্তব্য শোনেন ট্রাইব্যুনাল। জোহা জানান, আদালতের আদেশ অনুযায়ী গত ৭ এপ্রিল তারা মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় (শেনপাড়া) বাবুর বাসায় অভিযান চালান। তবে, সেখানে তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি জব্দ করা হয়। ডিবি ও মিরপুর মডেল থানা পুলিশের সহযোগিতায় পরিচালিত এই অভিযানের ধারাবাহিকতায় ৮ এপ্রিল বাবুর স্ত্রী ইসমাত জেরিনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল। তখন তিনি চার দিনের মধ্যে তার স্বামীকে আদালতে উপস্থিত করার অঙ্গীকার করেছিলেন।
প্রসিকিউটর জোহা আদালতকে জানান, জব্দ করা মোবাইল ফোনটি বর্তমানে ডিবি হেফাজতে রয়েছে, তবে তার ফেসবুক আইডিটি এখনও সক্রিয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা সাইবার স্কোয়াড নামে একটি গোপন গ্রুপ পরিচালনা করেন, যার অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন দণ্ডিত বাবু। এই গ্রুপের মূল কাজই হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালানো।’
শুনানিতে আসামিপক্ষে অংশ নেন আইনজীবী এমএ নোমান। অন্যদিকে, প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ান ও মঈনুল করিমসহ অন্যরা।
শুনানি চলাকালে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমাদের ট্রাইব্যুনাল নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তা সত্ত্বেও মানবিক দিক বিবেচনা করে আমরা এই আসামির জন্য নিঃশর্ত ক্ষমার আবেদন জানাচ্ছি।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও সাজা ঘোষণা
আদেশ প্রদানের সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আসামি কেবল একজন সচেতন নাগরিকই নন, তিনি একজন রাজনৈতিক নেতাও। তার অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে আমরা প্রথমে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যেহেতু সবাই তার নিঃশর্ত মুক্তি চাইছেন, তাই সাজা কিছুটা কমানো হলো।’
এরপর আদালত আসামিকে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। তবে, চিফ প্রসিকিউটরসহ অন্য প্রসিকিউটরদের বিশেষ অনুরোধে শেষ পর্যন্ত সাজা কমিয়ে দুই মাস নির্ধারণ করা হয়।
পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, ‘আসামির অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের অপরাধে সাজা না দিলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। আমরা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি যে, আমাদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। বিদেশি বিচারক বা আইনজীবীরাও আমাদের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। যেহেতু বিতর্কিত পোস্টটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই সাজা হওয়া জরুরি ছিল; যাতে অন্যরাও একটি স্পষ্ট বার্তা পান।’
একইসঙ্গে ওই ফেসবুক পোস্টে যারা লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করেছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের নাম-পরিচয় আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১।
রায় ঘোষণার পর দণ্ডিত পাটোয়ারী বাবুকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
গত ৭ এপ্রিল আদালত অবমাননার অভিযোগ আমলে নিয়ে বাবুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। আজ (রোববার) দুপুরে তিনি সস্ত্রীক আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পাটোয়ারী বাবু তার ফেসবুক পোস্টে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং আইনজীবী শিশির মনিরের ছবি যুক্ত করে শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘিরে মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছিলেন।
এমআরআর/এসএম
