বিজ্ঞাপন

রমনা বটমূলের বোমা হামলা : ২৫ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক আইনে মামলার বিচার

অ+
অ-
রমনা বটমূলের বোমা হামলা : ২৫ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক আইনে মামলার বিচার

২৫ বছর আগে ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলার বিচার এখনও শেষ হয়নি। কবে নাগাদ শেষ হবে নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি না হওয়ায় গত ৪ বছর ধরে বিচার আটকে আছে।

বিজ্ঞাপন

২০০১ সালে রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় ১০ জন প্রাণ হারান। ওই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়েছে ১২ বছর আগে। তবে হত্যা মামলার রায় ঘোষণার এক যুগ পার হলেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলার বিচার।

বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫ তে বিচারাধীন। সর্বশেষ গত ৩১ মার্চ এ মামলায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে আসামিরা দেশের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় তাদের আদালতে হাজির করা হয়নি। এজন্য বিচারক তাওহীদা আক্তার আগামি ৯ জুলাই আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির দিন রেখেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারি তানজীল হোসেন ভূঁইয়া।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২১ মার্চ এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। মামলাটিতে মোট ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জনের জবানবন্দি ও জেরার মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। ওই বছরের ৩ এপ্রিল আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন সাত আসামি। অপর আসামিরা পলাতক থাকায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। ওইদিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ১১ আগস্ট দিন ধার্য করেন আদালত। পরবর্তীতে কোন কার্যক্রম ছাড়াই ২০২২ সালের ২৮ জুলাই মামলাটি বদলি করে ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এ পাঠানো হয়। সেখান থেকে ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি পাঠানো হয় মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫ তে। মামলাটি এখন আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। গত তিন বছরের অধিক সময়ে ধরে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিস্ফোরক আইনের মামলার আসামিরা হলেন, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলাল উদ্দিন, শাহাদাতউল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, আলহাজ্ব মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আ. হাই।

আসামিদের মধ্যে আলহাজ্ব মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম পলাতক,  আকবর ও আবু তাহের জামিনে রয়েছেন। অপর সাত আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মাহফুজ হাসান বলেন, কারাগারে থাকা ৭ আসামি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন মামলায় আটক রয়েছেন। আত্মপক্ষ শুনানিতে আসামিদের উপস্থিত থাকতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের আদালতে হাজির করতে না পারায় আত্মপক্ষ শুনানি হচ্ছে না। তাদেরকে আদালতে হাজির করলে আত্মপক্ষ শুনানি হয়ে যাবে। রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে যথেষ্ট আন্তরিক।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এ ঘটনায় করা দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলার রায় হয়েছে।  ফ্যাসিস্ট সরকার আমলে এই বিস্ফোরক আইনের মামলাটি শেষ করতে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মামলাটিতে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল। সেজন্য অনেকটা সময় লেগেছে। 

তিনি আরও বলেন, মামলাটি আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটা রায়ের পর্যায়ে নিয়ে যাবো। আশা করছি, আগামি ২/৩ মাসের মধ্যে একটা রেজাল্ট পাওয়া যাবে।

আসামি আকবর ও আবু তাহেরের আইনজীবী জসিম উদ্দিন বলেন, এই মামলায় কিছুই নাই৷ একজনের জোরপূর্বক জবানবন্দি নিয়ে মামলাটি সাজিয়ে ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এই দু'জন কোনোভাবেই মামলায় জড়িত না, তারা সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ। সঠিকভাবে বিচার হলে তারা খালাস পাবেন এটাই প্রত্যাশা করছি। 

২০০১ সালের পহেলা বৈশাখ ভোরে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের স্থলে দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সকাল ৮টা ৫ মিনিটে একটি এবং এর পরপরই আরেকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিরীহ সাত ব্যক্তি প্রাণ হারান এবং ২০-২৫ জন আহত হন। পরে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে আরও তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। এতে ১৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ।

দুটি মামলার মধ্যে প্রায় ১৩ বছর পর হত্যা মামলার রায় হয় ২০১৪ সালের ২৩ জুন। রায়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত।

বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলাকালে বোমা হামলায় ১০ ব্যক্তি নিহত হন। নিহতরা হলেন, চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার দুবলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে আবুল কালাম আজাদ (৩৫), বরগুনা জেলার বামনা থানার বাইজোরা গ্রামের আবুল হোসেন ওরফে এনায়েত হোসেনের ছেলে জসিম (২৩), কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার বিরামকান্দি গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে এমরান (৩২), পটুয়াখালির সদর থানার ছোট বিমাই গ্রামের মৃত অনবী ভূষণ সরকারের ছেলে শ্যামলী পরিবহনের অসীম চন্দ্র সরকার (২৫), পটুয়াখালি জেলার বাউফল থানার কাজীপাড়া গ্রামের আবুল কাশেম গাজীর ছেলে মামুন (২৫), একই গ্রামের সামছুল হক কাজীর ছেলে রিয়াজ (২৫), একই এলাকার আবুল হাশেম গাজীর মেয়ে শিল্পী (২০), নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার রথি রুহিত রামপুর গ্রামের আবুল কালামের ছেলে ইসমাইল হোসেন স্বপন (২৭), ঢাকার দোহার থানার চরনটসোলা গ্রামের মৃত আয়নাল খাঁর ছেলে আফসার (৩৫) ও অপর একজন অজ্ঞাত পুরুষ।

এনআর/এনটি