রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রধান শহরগুলো দূষণের থাবায় আক্রান্ত। শিল্পবর্জ্য পতিত হয়ে রাজধানীর চারপাশের নদ–নদী মৃতপ্রায়। বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান প্রথম সারিতে। নিষিদ্ধ পলিথিনে সয়লাব বাজার কাঠামো। শব্দদূষণে অনেকেই কানে কম শোনার সমস্যায় ভোগেন। শিল্প শহর হিসেবে গড়ে ওঠা গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জেও একই অবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির পরিবেশ রক্ষায় পারদর্শিতা সূচক-২০২৪ অনুযায়ী, বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫ তম। তালিকায় সবার নিচে অর্থাৎ ১৮০তম অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম, এরপর ১৭৯তম অবস্থানে পাকিস্তান এবং ১৭৮তম অবস্থানে রয়েছে লাওস। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানও সূচকে বাংলাদেশের ওপরে। পরিবেশসংক্রান্ত ১১টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সূচকটি তৈরি করা হয়।
সার্বিকভাবে পরিবেশদূষণের এই যখন চিত্র, ঠিক বিপরীত ঘটনা পরিবেশ আদালতে। দেশে তিনটি পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা খুবই কম। পরিবেশ বিষয়ক মামলার জন্য নির্দিষ্ট আদালতে চলছে অন্য মামলার বিচার। পরিবেশ সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের সরাসরি মামলার সুযোগের অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনের করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ অনুযায়ী, একজন সাধারণ নাগরিক সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারেন না। মামলা করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকের লিখিত রিপোর্ট বাধ্যতামূলক, যা বিচার প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক বাধা সৃষ্টি করে। দেশের পরিবেশ দূষণ রোধে বিদ্যমান আইনের উপযুক্ত প্রয়োগ– খুব বড় চ্যালেঞ্জ বলে অনেকে মনে করছেন। পাশাপাশি পুরোনো আইনের সংশোধন একান্ত জরুরি বলে মন্তব্য আইনজ্ঞদের।

কোন আদালতে কত মামলা
ঢাকার পরিবেশ আদালতের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৩ সালে। ঢাকা অঞ্চলের জন্য দুটি পরিবেশ আদালত রয়েছে। তার মধ্যে একটি মূল আদালত, অন্যটি আপিল আদালত।
আদালত সূত্র জানায়, মূল পরিবেশ আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৮ হাজার ২৩১। এর মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে করা মামলার সংখ্যা মাত্র ১৩২টি, যা মোট মামলার মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এর বাইরে দেওয়ানী ফৌজদারিসহ অন্যান্য নিয়মিত মামলার বিচার হয় এই আদালতে।
সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকার পরিবেশ আদালতে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে ৩টি মামলা বিচারের জন্য পাঠানো হয়েছে। ২০২৪ সালে পাঠানো হয় ২টি। আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ২৩ বছরে মোট ৫৯২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৭৬টি।
ঢাকার পরিবেশ আদালতে কর্মরত সরকার নিযুক্ত প্রসিকিউটর (পিপি) মাসুদুর রহমান বাদল ঢাকা পোস্টকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এই আদালতে মামলা দেওয়া হয়। এখানে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি মামলা দায়ের করতে পারলে হয়তো মামলার সংখ্যা বাড়তো। বিদ্যমান আইন সংশোধন ছাড়া এ প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর নিজেরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে থাকে। তাদের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা থাকার কারণে আদালতে তাদের মামলার সংখ্যা কম।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে অবস্থিত পরিবেশ আপিল আদালতে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৭টি মামলা বিচারাধীন। এর বাইরে ওই আদালতে অন্য মামলা বিচারাধীন রয়েছে ১ হাজার ৪৪৯টি। এর মানে হলো, আপিল আদালতে মোট মামলার শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ পরিবেশসংক্রান্ত। এ আদালতের পিপি আবু ইউসুফ সরকার বলেন, আপিল আদালতে গত বছর পরিবেশবিষয়ক মামলা এসেছে মাত্র ৫টি। এর আগে ছিল ৮ মামলা। এর মধ্যে ৬ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, বাকি ৭ মামলা বিচারাধীন। এসব মামলার কোনটিই পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে চলেনি। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে সচেষ্ট আছি।
তৃতীয় পরিবেশ আদালতটি চট্টগ্রামে। ওই আদালত–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেখানে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিবেশসংক্রান্ত মামলা রয়েছে ৪৪টি। এর মধ্যে ২৮টি মামলা পাঁচ বছর থেকে বিচারাধীন।
ঢাকার পরিবেশ আদালতের নিষ্পত্তি করা মামলার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বেশির ভাগ মামলায় আদালত আসামিদের আর্থিক দণ্ড দিয়েছেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে সাজার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর বেশিরভাগই পরিবেশগত ছাড়পত্র না নেওয়ার দায়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক জরিমানার আওতায় আনা হয়।
কেবল পরিবেশ আদালতেই নয়, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সারা দেশে যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়, সেখানেও অর্থদণ্ড বেশি দেওয়া হয়। কারাদণ্ডের মতো সাজা দেওয়ার সংখ্যা কম। অবৈধ ইটভাটা, কালো ধোঁয়া, শব্দদূষণ, অবৈধ পলিথিন জব্দ, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য উৎপাদন, নির্মাণসামগ্রী দিয়ে পরিবেশদূষণসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে এ অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, পরিবেশ আদালতে সাধারণ মানুষ অথবা পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সরাসরি মামলা করতে পারে না। কেউ মামলা করতে চাইলে প্রথমে অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ জানাতে হয়। প্রতিকার না পেলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতে মামলা করতে পারেন।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ব্যত্যয় করছেন, তাহলে ক্ষতি নির্ধারণ করে তা পরিশোধের নির্দেশ দিতে পারবেন। এ নির্দেশ অমান্য করে ক্ষতিপূরণ না দিলে মহাপরিচালক আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা অথবা ফৌজদারি মামলা করতে পারবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) মো. খালেদ হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা কম হলেও আমাদের অধিদপ্তরে মামলার সংখ্যা অনেক। এছাড়া সারাদেশেই বিভিন্ন স্পেশাল আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। এজন্য স্পেসিফিক পরিবেশ আদালতে মামলা কম। আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দোষীদের জরিমানা করি। আমাদের এখানে ভুক্তভোগী বা সচেতনদের অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিই, পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে মনিটরিং করা হয়।
তিনি আরও জানান, ভুক্তভোগীদের সরাসরি মামলা করার বিষয়ের আইনের সংশোধনের একটি প্রস্তাব অধিদপ্তরকে পাঠানো হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারেন, কিংবা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী স্থানীয় থানায় এজহার দায়ের করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিবেশ আদালতে মামলা কম হওয়ার অন্যতম একটি কারণ সরাসরি মামলার সুযোগ না থাকা। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন এ জন্য আইন সংশোধনের দাবি করেছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ) প্রতিষ্ঠাতা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশনীতি বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মাহবুবুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, পরিবেশ আদালতে পরিবেশসংক্রান্ত মামলা কম থাকায় অন্যান্য মামলার বিচারকাজও হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর মামলার চেয়ে অর্থদণ্ডের দিকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে আসছে। এ ছাড়া আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালতকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। পরিবেশ আদালতের আইনের সবচেয়ে বড় সমস্যা–এ আইনে আদালতে সাধারণ মানুষ বা সংগঠন সরাসরি মামলা করতে পারে না। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মাত্র দুটি পরিবেশ আদালত এবং ঢাকায় একটি পরিবেশ আপিল আদালত কার্যকর রয়েছে। এদেশের মানুষের জন্য এই সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। বাস্তবে দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি পরিবেশ আদালত থাকা প্রয়োজন ছিল।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ ব্যবহারের কারণে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের একার পক্ষে এই দূষণকারীদের প্রতিরোধ করা সম্ভব না। পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে নাগরিকদের সঙ্গে নিতে হবে। যত বেশি নাগরিক আইনের আশ্রয় নেবে পরিবেশ অধিদপ্তর তত শক্তিশালী হবে। কিন্তু আইন প্রয়োগ ব্যবস্থায় পরিবেশ অধিদপ্তরকে ভ্রাম্যমাণ আদালত নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে; যাতে পরিবেশ আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। পরিবেশ আদালত আইন সংস্কার বর্তমান সময়ে জরুরি একটি বিষয়। এ আইনে নাগরিকদের সরাসরি মামলা করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তবে বিদ্যমান পরিবেশ আদালত আইনের সংশোধন না করা হলে পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে না।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, পরিবেশ আদালত ও পরিবেশ আইনের কার্যকর সংস্কার ছাড়া বাস্তবে পরিবেশ দূষণ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ শুধু আইন প্রণয়ন করলেই পরিবেশ রক্ষা সম্ভব হয় না; সেই আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন- শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা, কঠোর নজরদারি এবং দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা। বাংলাদেশে অনেক সময় শিল্পকারখানার বর্জ্য, ইটভাটার ধোঁয়া, নদী দখল, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না। পরিবেশ আদালত যদি দ্রুত বিচার, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে দূষণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সহজে আইন ভাঙার সাহস পাবে না। পাশাপাশি পরিবেশ আইনকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করা জরুরি, যাতে জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ, ই-বর্জ্য ও শিল্পবর্জ্যের মতো নতুন সমস্যাগুলোও আইনের আওতায় কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়। তাই বলা যায়, পরিবেশ আদালত ও আইনের সংস্কার পরিবেশ সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, দেশে পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা এত কম হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ আইন ও আদালত সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকেই জানেন না যে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা যায়। দ্বিতীয়ত, মামলা পরিচালনার প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় মানুষ অনেক সময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তৃতীয়ত, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে সাধারণ মানুষ ভয় পায়। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি মামলা করা যায় না, যা বিচারপ্রাপ্তিকে সীমিত করে। পর্যাপ্ত পরিবেশ আদালত, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণেও পরিবেশ সংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।
এনআর/এসএম
