দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় হংকংয়ে কাটিয়েছেন আজিজুল আলম (৫৫)। সেখানে একাধিক সফল ব্যবসাও ছিল তার। কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে রাজধানীর উত্তরায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। কিন্তু জীবনের অধিকাংশ সময় বিদেশে কাটানো এই প্রবাসী কথিত ‘ম্যাগনেট পিলার’ পাওয়ার আশায় খুইয়েছেন নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং আরও ১৫ কোটি টাকা মূল্যের জমি।
‘কালো জাদু’ ও সম্মোহনের খপ্পরে পড়ে সব হারিয়ে শেষ পর্যন্ত এক কথিত ফকিরসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেছেন তিনি।
তবে, এই মামলাকে কেন্দ্র করে এখন আদালত পাড়ায় শুরু হয়েছে নতুন নাটকীয়তা। মামলার এজাহারনামীয় দুই নারী আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বাদীপক্ষের অভিযোগ, প্রধান আসামির স্ত্রী ও মামলার ৩ নম্বর আসামি শারমিন আক্তার একা (৩৫) নামে যিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন, তিনি আসলে প্রকৃত আসামি নন; বরং তার বোন! এই ‘আয়নাবাজি’র পর আসল আসামি শনাক্তে পুলিশকে সময় বেঁধে দিয়েছেন ঢাকার একটি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
আদালত ও প্রসিকিউশন শাখা সূত্রে জানা যায়, প্রতারণার এই মামলায় প্রধান আসামি মো. মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকিরের স্ত্রী শারমিন আক্তার একা এবং ১৪ নম্বর আসামি লাইলী শাহনাজ খুশি (একার মা) ওরফে মুন্নি গত ১২ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। ওই দিন আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
হংকং প্রবাসী আজিজুল আলমকে কথিত ‘ম্যাগনেট পিলার’ বিক্রির নামে কালাজাদু ও ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ খাইয়ে সম্মোহিত করে প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং ১৫ কোটি টাকার জমি হাতিয়ে নিয়েছে এক সুসংগঠিত প্রতারক চক্র। জিনের বাদশা, জিনের রানি ও বিদেশি বায়ার সেজে প্রবাসীকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মালিক বানানোর মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে সর্বস্বান্ত করার অভিযোগে ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে
পরবর্তীতে ১৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহবুবুল আলম আসামিদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রিমান্ড শুনানিকালে বাদীপক্ষের আইনজীবী আদালতকে একটি পৃথক আবেদন দিয়ে জানান, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারী প্রকৃত পক্ষে আসামি শারমিন নন। এরপর আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রকৃত আসামি শনাক্ত করে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
‘ম্যাগনেটিক পিলারে’ প্রতারণার ফাঁদ: মিষ্টি, ফল ও তাবিজে সম্মোহন
আসামিদের রিমান্ড আবেদনে পুলিশ উল্লেখ করেছে, এই চক্রের প্রধান মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির একজন পেশাদার প্রতারক। তার দলে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন সদস্য রয়েছে। তারা সুকৌশলে দেশের বড় বড় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আসছিল। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন ছদ্মনাম ও চরিত্রে অভিনয় করত। তাদের প্রতারণার মূল কৌশল ছিল— জিনের মাধ্যমে অলৌকিকভাবে প্রাচীন মূল্যবান ম্যাগনেট পিলার ও কয়েন নিয়ে এসে ভুক্তভোগীদের দেখানো, যার কাল্পনিক মূল্য ধরা হতো ১০০ বিলিয়ন ডলার। যা ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া ও প্রতারণার ফাঁদ।

এই চক্রের কেউ সাজত জিনের বাদশা, কেউ জিনের বাবা, কেউ জিনের রানি, আবার কেউ জিনের মা। কেউবা ফকির সেজে অলৌকিক ক্ষমতার অভিনয় করত, আর বাকিরা সাজত সেই পিলার বিদেশে চড়া দামে বিক্রির ‘বিদেশি বায়ার’। এর মধ্যে আসামি শারমিন সাজত ‘জিনের রানি’ এবং তার মা লাইলী ওরফে মুন্নি (৬০) সাজত ‘জিনের মা’। তারা মোবাইলে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে ভিকটিমদের বলত, ‘বাবা তুমি তো দুনিয়ার বাদশা, আখিরাতেরও বাদশা।’
আবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী ব্যবসায়ী আজিজুল আলমকে ফাঁদে ফেলে চক্রটি দাবি করে, তার আশা পূরণ করতে হলে বিভিন্ন মাজারে সিন্নি দিতে হবে, যেখানে জিনেরা এসে খাবার খাবে। এই সিন্নির জন্য গরু, মহিষ ও ছাগল কিনতে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করা হয়। এভাবে বিভিন্ন সময়ে মিষ্টি, ফল ও তাবিজে সম্মোহিত করে বাদীর কাছ থেকে নগদ ও ব্যাংকের মাধ্যমে মোট ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। পরবর্তীতে বাদী আরও টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আসামিরা তাকে ভয় দেখিয়ে বলেন, টাকা না থাকলে ঘরের স্বর্ণালংকার দিয়ে দিতে হবে। তাদের কথামতো ওই ব্যবসায়ী তার স্ত্রী ও মায়ের ব্যবহৃত ২০০ ভরি স্বর্ণালংকার (যার বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা) আসামিদের হাতে তুলে দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহবুবুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ১০-১২ বছর আগেও এই সোহেল ফকির ও তার পরিবার অতি নিম্নমানের জীবনযাপন করত। কিন্তু প্রতারণার টাকায় বর্তমানে তারা মিরপুর ডিওএইচএস, বসুন্ধরা, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, অফিস ও দামি গাড়ির মালিক হয়েছেন। নিজ গ্রামেও তারা বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। অথচ দৃশ্যত তাদের আয়ের কোনো বৈধ উৎস নেই।’
মামলার এজাহারনামীয় দুই নারী আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে শুনানিকালে বাদীপক্ষ অভিযোগ তোলে, কারাগারে আটক ৩ নম্বর আসামি শারমিন আক্তার একা মূলত ছদ্মবেশী এবং তিনি আসল আসামি নন, বরং তার বোন আদালতের কাঠগড়ায় প্রক্সি দিয়েছেন। এই নজিরবিহীন ‘আয়নাবাজি’র পর প্রকৃত আসামি শনাক্তে পুলিশকে সময় বেঁধে দিয়েছেন আদালত
তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীর আত্মসাৎ করা টাকা ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার এবং চক্রের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে ১৪ মে আসামিদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়। শুনানিকালে বাদীপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন যে, আত্মসমর্পণকারী নারী প্রকৃত শারমিন নন। যেহেতু বর্তমানে ওই নারী জেলহাজতে আছেন, তাই তার প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে আসামির এনআইডি, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদপত্র ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এজন্য আদালতের কাছে আরও সাত দিনের সময় চাওয়া হয়েছে এবং আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম শান্ত ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি, যিনি শারমিন হিসেবে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন তিনি মূলত তার বোন। অর্থাৎ প্রধান আসামির স্ত্রীর জায়গায় তার শ্যালিকা আদালতে প্রক্সি দিয়েছেন। তাই আমরা প্রকৃত আসামি শনাক্ত করার জন্য পৃথক আবেদন করি এবং আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন।’
‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ও সম্মোহনের ঘোর
মামলার অভিযোগে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে মিজান নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই চক্রের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। চক্রের সদস্যরা তাকে জানায়, তাদের কাছে অলৌকিক ক্ষমতার প্রাচীন ম্যাগনেট পিলার আছে, যা বিদেশে ১০০ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করা সম্ভব। প্রধান আসামি সোহেল ফকির তার সুন্নতি লেবাস ও চটকদার কথায় দ্রুতই প্রবাসীর বিশ্বাস অর্জন করেন।

বাদীর দাবি, বিশ্বাস অর্জনের পর তাকে বিভিন্ন কুফরি কালাম ও ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ব্যবহার করে হিপনোটাইজ বা সম্মোহিত করা হয়। বিভিন্ন সময় মিষ্টি ও পানীয়র সঙ্গে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে তার মস্তিষ্ক বিকল করে দেওয়া হতো, যার ফলে তিনি চক্রটির সম্পূর্ণ অনুগত হয়ে পড়েন।
মাঝেমধ্যেই ‘হযরত তৈয়ব আহম্মেদ চিশতী’ নামে জিনের বাদশা পরিচয় দিয়ে তাকে ফোন করে বলা হতো, ‘বাবা তুই তো দুনিয়ার বাদশা, আখিরাতেরও বাদশা হয়ে গেছিস। তুই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মালিক হবি।’ এছাড়া, তাকে দামি গাড়ি, বাড়ি এবং আমেরিকা নেওয়ার প্রলোভনও দেওয়া হতো। জিনের মা সেজেও অন্য নারী আসামিরা তাকে ফোন করে ঘোরের মধ্যে রাখত।
তদন্তকারী পুলিশ জানায়, প্রতারক চক্রের মূল হোতা সোহেল ফকির ও তার পরিবার ১০ বছর আগেও অতি নিম্নমানের জীবনযাপন করত। বর্তমানে দৃশ্যমান কোনো বৈধ উৎস ছাড়াই তারা বসুন্ধরা, ধানমন্ডিসহ অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ির মালিক বনে গেছে। আসামিদের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে তাদের এনআইডি, পাসপোর্ট ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের পাশাপাশি রিমান্ডের আবেদন করেছে পুলিশ
এই জিনের বাদশার ভয় ও সম্মোহনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত আসামিরা কয়েক দফায় মোট ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। একপর্যায়ে ব্যবসায়ীর অফিসের ভল্টে রাখা মা ও স্ত্রীর ব্যবহৃত ২০০ ভরি স্বর্ণালংকারও নিয়ে যায় তারা। এরপর উত্তরখান এলাকায় তার মালিকানাধীন ২৭.১৫ কাঠা জমি (যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৪-১৬ কোটি টাকা) জোরপূর্বক দলিলের মাধ্যমে লিখে নেয় আসামিরা।
ভুক্তভোগী জানান, দীর্ঘদিন একধরনের ঘোরের মধ্যে থাকার পর ওষুধের প্রভাব এবং কালাজাদুর মোহ ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করলে তিনি স্বাভাবিক হন। সবকিছু বুঝতে পেরে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে গত মাসে রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানায় ২৪ জনকে আসামি করে এই প্রতারণা মামলা দায়ের করেন।
মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন— মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির (৩৮), তার স্ত্রী শারমিন আক্তার একা (৩৫), দুই ভাই মো. সবুজ ও রুবেল, শাশুড়ি লাইলী শাহনাজ খুশি ওরফে মুন্নি (একার মা), নাজমুল হাসান এবং এ আর রাসেল।
এনআর/এমএআর/
