বিজ্ঞাপন

তাইম হত্যায় চা দোকানির চাঞ্চল্যকর বর্ণনা, ভিডিও ফুটেজে ভয়াবহ দৃশ্য

তাইম হত্যায় চা দোকানির চাঞ্চল্যকর বর্ণনা, ভিডিও ফুটেজে ভয়াবহ দৃশ্য

বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে খোশগল্প করছিলেন তাইম। কিন্তু মুহূর্তেই সেই আড্ডা রূপ নেয় ভয়াবহ ঘটনায়। শুরু হয় গোলাগুলি। পুলিশের নির্দেশে প্রথমে দোকান বন্ধ করে রাখেন দোকানি। মিনিট কয়েক না যেতেই ফের দোকান খুলতে বলে পুলিশ। দেখানো হয় গুলি করার ভয়ও। নিরুপায় হয়ে দোকানি শাটার খুলতেই টেনেহিঁচড়ে তাইমদের বাইরে নিয়ে যান পুলিশ সদস্যরা। চালানো হয় একের পর এক গুলি। শেষমেশ প্রাণ হারান তাইম।

মঙ্গলবার (৯ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এমনই চাঞ্চল্যকর বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী দোকানদার মো. সালাউদ্দিন লিটন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ২২তম সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

জবানবন্দিতে লিটন বলেন, যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফুটওভার ব্রিজের উত্তর পাশে আমার চা-বিস্কুটের দোকান ছিল। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টায় আমি দোকান খুলি। দুপুর ১২টার দিকে চা খেতে আসেন তাইম, শাহরিয়ার ও রাহাত। তারা তিনজন মিলে কথা বলছিলেন। এমন সময় আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোকান বন্ধ করার নির্দেশ দেন যাত্রাবাড়ী থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য। দোকান বন্ধের পর আমরা চারজনই ভেতরে থেকে যাই। একপর্যায়ে দোকানের শাটার খুলতে বলে পুলিশ। 

এই চা দোকানি বলেন, পুলিশের কথায় প্রথমে শাটার খুলিনি। কিন্তু তারা বাইর থেকে বলতে থাকেন- 'শাটার খুলবা নাকি গুলি করবো'। পরে আমি তাইমদের পুলিশের কাছে আত্মসমর্পন করতে বলে দোকানের শাটার খুলে দেই। ওই সময় আমরা চারজনই হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। তখন ভেতরে ঢুকে আমাকে দুটি চড়-থাপ্পড় মারেন একজন পুলিশ সদস্য। এরপর একে একে তাইম, শাহরিয়ার ও রাহাতকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যান তারা। একপর্যায়ে আমাদের রাইফেলের বাঁট দিয়ে বেধড়ক মারধর করতে থাকেন।

তিনি বলেন, আমার দিকে রাইফেল তাক করে রাখেন দুজন পুলিশ সদস্য। অপর দুজন মিলে মারতে থাকেন। বাকিরা আমার দোকানে ঢুকে চিপসসহ অন্যান্য জিনিসপত্র লুটে নেন। একইসঙ্গে দোকানের ক্যাশবক্স থেকে ২৫ হাজার টাকাসহ সিগারেট নিয়ে যান। এরপর আমাকে দোকানের শাটার বন্ধ করতে বলা হয়। দোকান থেকে বেরিয়ে দেখি তাইম গুলিবিদ্ধ। তাকে ওঠানোর চেষ্টা করছেন রাহাত। একপর্যায়ে আমি ও শাহরিয়ারও সহায়তা করি। তখন একজন পুলিশ সদস্য আমাকে জিজ্ঞেস করেন, 'কি করতেছো'। আমরা বলি- 'ছেলেটার শরীরে গুলি লেগেছে, ওকে হাসপাতালে নিতে হবে'। পুলিশ সদস্যরা বলেন- 'আমরা ওকে হাসপাতালে পাঠাবো। তোমরা যাবা নাকি গুলি করবো'। এরপর আমরা বাসায় চলে যাই।

লিটন আরও উল্লেখ করেন, দুদিন পরে শাহারিয়ার আমাকে ফোন করে তাইমের খবর জানি কিনা জিজ্ঞেস করেন। একপর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাইমের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়। পরে শুনেছি, শাহারিয়ারও কিছুদিন আগে মারা গেছেন।

কিছুদিন পর দোকানের একজন ক্রেতা আমাকে বলেন, 'মামা তোমার দোকানের ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে, তুমি কি দেখেছো'। পরে তিনি আমাকে ভিডিওটি দেখান। এতে দেখা যায় যে, আমার দোকান থেকে লুট করা জিনিসপত্র পুলিশের হাতে এবং তাইমকে গুলি করছেন একজন পুলিশ সদস্য। দুই মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের ভিডিওটি ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়। 

ভিডিও ফুটেজের ৫২ সেকেন্ড থেকে এক মিনিট ৪ সেকেন্ড পর্যন্ত হেলমেট পরা একজন পুলিশ সদস্যকে তাইমের দিকে গুলি করতে দেখা যায়। ওই সময় তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন রাহাত। দুই মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে লাল গেঞ্জি পরা অবস্থায় আহত তাইমকে উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন দোকানি লিটন। এছাড়া লিটনের সঙ্গে থাকা সাদা হাফপ্যান্ট পরা খালি গায়ে ছিলেন শাহারিয়ার। গুলি বর্ষণকারী পুলিশ সদস্যের নাম জাকির।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যান্যরা।

এ মামলায় ১১ আসামির মধ্যে দুজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী। তাদের আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

পলাতক আসামিরা হলেন- ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।

এমআরআর/এসএম