শেখ হাসিনার পতনের বিজয় মিছিলে গিয়ে প্রাণ হারান সানজিদ হোসেন মৃধা। ১৬ বছরের ছেলের নিথর দেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে নানামুখী আক্রমণের শিকার হন বাবা। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মারও খেতে হয়। এমনকি লাশ দাফনেও আসে বাধা। শেষমেশ তাদের হাত-পা ধরে কাকুতি-মিনতি জানিয়ে চোখের জলে কবরে রেখে আসেন একমাত্র ছেলেকে।
এমনই বর্ণনা উঠে এসেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ সানজিদের বাবা কবির হোসেন মৃধার জবানবন্দিতে। মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল আজ (১৫ জুন)।
এদিন সপ্তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন কবির হোসেন। তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল।
কবির হোসেন একজন রংমিস্ত্রি। তার দুই সন্তানের মধ্যে সানজিদের বয়স ছিল ১৬ বছর। বড় মেয়ের বিয়ে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে বনানীতে কাজে চলে যান তিনি। ওই দিন প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে শেখ হাসিনার পালানোর খবর পেয়ে বিকেল ৩টার দিকে বোন-দুলাভাইয়ের সঙ্গে উত্তরার বিএনএস এলাকায় বিজয় মিছিলে অংশ নেন সানজিদ। একপর্যায়ে গোলাগুলি দেখে একেকজন একেক দিকে দৌড় দেন তারা।
জবানবন্দিতে কবির বলেন, গুলির শব্দ পেয়ে দৌড়ে আমির কমপ্লেক্সের সামনে চলে যায় আমার ছেলে সানজিদ। ওই সময় ওপর থেকে ছোড়া একটি গুলি এসে তার গলার সামনের দিকে লেগে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে ছেলেটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখন তাকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যান আশপাশের লোকজন। দীর্ঘক্ষণ ধরে সানজিদের ফোনে ফোন দিতে থাকে আমার মেয়ে। কিন্তু নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে তাকে ফোনে পাচ্ছিল না। পরবর্তীতে অন্য একজন ফোন ধরে ছেলের গুলিবিদ্ধের খবর জানান। একইসঙ্গে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে যেতে বলেন। তখন আমাকে ফোন দিয়ে সানজিদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর জানানো হয়।
সানজিদের বাবা বলেন, বনানীতে থাকায় রাত ৮টার দিকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে পৌঁছাই। হাসপাতালে গিয়ে মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে পাই। আর সানজিদের লাশটি মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখি। ওই দিন একই হাসপাতালে আরও আটজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। চিকিৎসকরা এসব লাশ নিয়ে যেতে তাড়া দিতে থাকেন। তখনও বাইরে প্রচুর গোলাগুলি হওয়ায় আমি লাশ নিয়ে বের হতে পারিনি। একপর্যায়ে লাশটি বের করে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
তিনি বলেন, ছেলের লাশ বের করে দেওয়ায় একটি রিকশায় তুলে বাসায় ফিরছিলাম। কিন্তু পথে অনেক জায়গায় বাধাগ্রস্ত হই। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হই। গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীরের নির্দেশে ছাত্রলীগের কর্মীরা রড দিয়ে আমাকে ও রিকশাচালককে মারধর করেন। নানা বাধা পেরিয়ে টঙ্গীতে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাই। তবে টঙ্গী এরশাদনগর সরকারি কবরস্থানে ছেলের লাশ দাফন করার সময় জাহাঙ্গীরের ছেলেরা বাধা দেন। তাদের হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করে ছেলেকে দাফন করি।
সাক্ষ্যে কবির জানান, পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের গুলিতে তার ছেলেসহ অন্য আটজন মারা গেছেন। হাসপাতালের বাইরেও ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ছেলেরা গুলি করেছিল। তারা হাসপাতালের ভেতরে ভাঙচুরসহ আহতদের কোনো চিকিৎসা না দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে ৫ আগস্ট বিকেল ৩টার পর থেকেই উত্তরা এলাকায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের গুলিতে ৩৫ জনেরও বেশি নিহত হন।
এ সময় সানজিদ হত্যার জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের বিচার চেয়েছেন কবির হোসেন। তিনি বলেন, তারা ইন্টারনেট সেবা বন্ধ না করার নির্দেশ দিলে সঠিক সময়ে ছেলের গুলিবিদ্ধের খবরটি জানতে পারতাম। ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারতাম। হয়ত সানজিদ বেঁচে যেত। আমার বুক খালি হতো না।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মামুনুর রশিদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, শাইখ মাহদীসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
কবির হোসেনের জবানবন্দি শেষ হলেও জেরার সময় চেয়েছেন পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদ। পরে জেরার জন্য আগামী ২৫ জুন দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
এমআরআর/এমএন
